সদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়া থেকে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্রসদ্য স্বাধীন কলকাতার সাহেবপাড়ার জটিল জীবনযাত্রা, মানুষের টানাপোড়েন, আর সেই সময়ের সামাজিক আবহ। সবকিছু মিলিয়ে তিনি লিখেছিলেন চৌরঙ্গী (Chowringhee)। এই কালজয়ী সাহিত্যকর্মের রচয়িতা, বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় (Mani Shankar Mukherjee)।
শংকরের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল এক উজ্জ্বলভাবে। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত প্রথম বইটি পাঠকমহলে তাকে পরিচিতি এনে দেয়। অল্প বয়সে রচিত এই রচনার সাফল্যই তার দীর্ঘ সাহিত্যপথের ভিত্তি স্থাপন করে।
মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়য়ের বহু উপন্যাস বড় পর্দাতেও সফলভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) তাঁর সীমাবদ্ধ ও জন অরণ্য উপন্যাস অবলম্বনে ছবি নির্মাণ করেছিলেন। চৌরঙ্গী থেকেও তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় সিনেমা, যেখানে মহানায়ক উত্তম কুমার (Uttam Kumar) স্যাটা বোসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে শংকর একবার বলেছিলেন, “সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।”
জনপ্রিয়তার নিরিখে চৌরঙ্গী এক অনন্য মাইলফলক। ২০১২ সাল পর্যন্ত এই উপন্যাসটির ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যে বিরল কৃতিত্ব। বোধোদয় প্রকাশের পর তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত হন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (Sharadindu Bandyopadhyay) তাঁকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেন—“ব্রাইট, বোল্ড, বেপরোয়া।” উপন্যাসটি পড়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।”
শংকর নিজেও স্বীকার করেছিলেন, পাঠকমহলের নিন্দা-প্রশংসা মিলিয়েই তিনি বোধোদয়কে ভালোবাসতে শিখেছিলেন।
সত্তরের দশকের অশান্ত কলকাতার পটভূমিতে লেখা স্থানীয় সংবাদ এবং সুবর্ণ সুযোগ—এই দুই উপন্যাসসহ জন্মভূমি সংকলন প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি সংকলনের ১০২তম সংস্করণ এসেছে, যা তাঁর লেখার দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার প্রমাণ।
প্রয়াণদিবসে শংকরের স্মৃতিতে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন,
আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন শংকর। বয়সে একটু বড়। লেখক জীবনের শুরু থেকেই ওঁকে চিনি। একজন আদ্যন্ত ভদ্রলোক, ভালো মানুষ। সবচেয়ে বড় ব্যাপার এত বড় লেখক, ওঁর ব্যবহারে কখনও বোঝা যেত না। নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারতেন। তাঁর ‘কত অজানারে’, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘চৌরঙ্গী’ তো রয়েইছে পছন্দের তালিকায়। এ ছাড়া কত লেখাই তো আছে, যে গুলো মন ছুঁয়েছে বার বার।
অসাধারণ এই মানুষটির আজ প্রয়াণ ঘটল। সারাজীবনই ভীষণ সক্রিয় ছিলেন শংকর। ইদানিং হয়তো তেমন লিখছিলেন না। তবে বইমেলায় বসে ওই একটা দৃশ্য, সত্যিই ভুলতে পারি না এখনও। দে’জ পাবলিকেশনের সামনে বই সাজিয়ে বসতেন। সেখানে পর পর সই দিয়ে যেতেন। এত উৎসাহ তিনি ছাড়া আর কারও মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। পাঠকের প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতা শেখার মতো বিষয়। একজন শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধুকে হারালাম। সবচেয়ে বড় কথা বাংলা সাহিত্যে বিরাট এক শূন্যতা সৃষ্টি হলো। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও প্রণাম।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে পাঠকমনে অমর হয়ে থাকা শংকর আজও বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম।