গত ১ এবং ২ মার্চের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার শুরু হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কিছু সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আক্রমণ মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল।
এই হামলার ফলে ইরানের সুুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে পুরো অঞ্চলে এক চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এতে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর (যেমন হিজবুল্লাহ বা হুথি) পক্ষ থেকে বড় ধরনের পাল্টা হামলার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই অভিযানের পর পরই বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করে। আল জাজিরার তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি-র এক-তৃতীয়াংশ প্রবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, সংঘাতের ফলে এই সংকীর্ণ জলপথটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ইরানের সামরিক মহড়া এবং ট্যাঙ্কারের ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় অনেক জাহাজ কোম্পানি এই পথ এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে ৫ থেকে ১০ সেন্ট করে প্রতিদিন বাড়ছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতি যখন মুদ্রাস্ফীতি কাটিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই এই যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করল। নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার।
এই অস্থিরতা কেবল তেলের দামেই সীমাবদ্ধ নয়। বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি এড়াতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে স্বর্ণের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এনবিসি এক নিউজে জানায়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ার বাজারগুলো, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের স্টক এক্সচেঞ্জগুলো চরম অস্থিরতার কারণে সাময়িকভাবে লেনদেন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে ওপেকের (OPEC+) ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল জাজিরার সূত্রমতে, সৌদি আরব এবং রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন আটটি দেশ এপ্রিল মাস থেকে দৈনিক প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদার তুলনায় এই জোগান অত্যন্ত সামান্য।
অন্যদিকে ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হলো চীন। যুদ্ধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মতে, চীন এখন বাধ্য হয়ে রাশিয়ার ওপর অধিক নির্ভরশীল হচ্ছে অথবা তাদের কৌশলগত রিজার্ভ থেকে তেল ব্যবহার শুরু করেছে। ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি একটি বড় ধাক্কা, কারণ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর তাদের নির্ভরতা অনেক বেশি।
এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল একটি সামরিক বিজয় বা পরাজয়ের বিষয় নয়। এটি মূলত একটি ‘এনার্জি কোল্ড ওয়ার’ বা জ্বালানি স্নায়ুযুদ্ধের নতুন সংস্করণ। ইরানের শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের যে ডাক ওয়াশিংটন থেকে দেওয়া হচ্ছে, তার ফলাফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য এক স্থবিরতার সম্মুখীন।
সোজা কথায় বলতে গেলে, এই ঘটনা বিশ্বকে এক নতুন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। পরিস্থিতি এখন নির্ভর করছে ইরান কীভাবে এর চূড়ান্ত জবাব দেয় এবং বিশ্বশক্তিগুলো হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে কতটা সক্ষম হয় তার ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল যদি এখনই নেভানো না যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য এক গভীর মন্দার কবলে পড়তে হতে পারে। তেলের দাম কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি বর্তমান বিশ্বের গতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি, আর সেই গতি আজ এক বড় প্রশ্নের মুখে।