ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে পেন্টাগন। কিন্তু যুদ্ধের চার দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক মহল থেকে শুরু করে খোদ ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের মধ্যেও একটি প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে; এই যুদ্ধের লক্ষ্য আসলে কী? এবং এর শেষ কোথায়?
অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। যুদ্ধের প্রথম দিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স দাবি করেছিলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করাই তাদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় সেই সুর বদলে যায়। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন বলছেন তেহরানে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ বা রেজিম চেঞ্জের কথা। আবার মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের মতে, ইরানের মিসাইল সক্ষমতা কমিয়ে আনাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্যহীনতা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে জটিল করে তুলেছে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা প্রস্থান পথ ছাড়াই আমেরিকাকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছেন। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরেও এখন অসন্তোষ দানা বাঁধছে। সাবেক কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে “একদল অসুস্থ মিথ্যাবাদী” বলে অভিহিত করেছেন, কারণ ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি আমেরিকাকে আর কোনো “বোকার মতো যুদ্ধে” (stupid wars) জড়াবেন না।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করছে। তবে এই ‘কার্পেট বম্বিং’ ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কতটা দমাতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর দেশটির চেইন অফ কমান্ড বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। আর এটিই এখন আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি বিবৃতিতে সগর্বে জানিয়েছেন যে, তাদের সামরিক ইউনিটগুলো এখন ‘weapons free’ মোডে রয়েছে অর্থাৎ তারা কেন্দ্রীয় আদেশ ছাড়াই স্বাধীনভাবে হামলা চালাতে সক্ষম। একে বলা হচ্ছে ‘মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেম’। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকা যদি এখন যুদ্ধবিরতি করতেও চায়, তবে তেহরানে এমন কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই যার সাথে তারা আলোচনা করবে। আমেরিকা কার্যত ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ধ্বংস করে নিজেই নিজের আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে এখন একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক তুঙ্গে। ইসরায়েল কি আমেরিকাকে এই যুদ্ধে জোর করে টেনে এনেছে? মার্কো রুবিওর মতো সিনেটররা দাবি করছেন, ইসরায়েল আক্রান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল বলেই আমেরিকা আগেভাগে হামলা করেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এখন সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। রয়টার্স ও ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জনমত জরিপ বলছে, মাত্র ৩০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছেন। ৬০ শতাংশই মনে করেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত একটি বড় ধরনের ভুল।
যুদ্ধের আঁচ সরাসরি গিয়ে লেগেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে রহস্যময় মিসাইল হামলার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। শুরুতে ইরানকে দোষারোপ করা হলেও, এখন রিয়াদ নিজেই তদন্ত করছে যে এই হামলার পেছনে ইসরায়েলের কোনো হাত আছে কি না, যাতে সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো যায়।
এদিকে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্রেট অফ হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে; বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০-১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউরোপে গ্যাসের দাম ইতিমধ্যে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ভারত, যারা তাদের অপরিশোধিত তেলের ৫৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, তারা এক ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েল উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করলেও ইরান ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের মাধ্যমে জবাব দিচ্ছে। ব্লুমবার্গের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল (যা ইরানের মিসাইল ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয়) মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে। বিপরীতে ইরান দাবি করেছে, তাদের কাছে কয়েক মাসের যুদ্ধের রসদ মজুত রয়েছে।
আমেরিকার অভ্যন্তরেও সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা নিজেদের গোলায় তিনটি মার্কিন F-15 যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পেন্টাগন এখন ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম সরিয়ে এনে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে আমেরিকার সামরিক ভারসাম্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ইতিহাস সাক্ষী, লিবিয়া, ইরাক বা আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে সাময়িক বিজয় আসলেও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আসেনি। ইরানে একটি বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় ১৬০ জনের মৃত্যু বা মার্কিন দূতাবাসের ওপর হামলা, সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূতরা সতর্ক করছেন যে, ইরান এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তাদের হারানোর কিছু নেই।