১.
প্রাচীন রোমের আকাশে যখন প্রথম সূর্য উঠেছিল, তখন সেটি কোনো এক সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নির্দেশে ওঠেনি। বরং হাজারো ছোট ছোট ‘স্পিরিট’ বা আত্মার উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল রোমের প্রতিটি অলিগলি। রোমানদের কাছে ধর্ম ছিল এক অদ্ভুত সামাজিক চুক্তি। তারা বিশ্বাস করত, যদি তারা নিয়মমাফিক দেবতাদের পূজা দেয়, তবে দেবতারা বিনিময়ে রোমকে রক্ষা করবেন। একে বলা হতো Pax Deorum বা ‘দেবতাদের সাথে শান্তি’।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এই শান্তিবচনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অভাবনীয় পরিবর্তনের গল্প। কীভাবে একটি কৃষিভিত্তিক সমাজের ঘরোয়া বিশ্বাসগুলো গ্রিক দর্শনে জারিত হলো, সম্রাটের পূজায় বিবর্তিত হলো এবং শেষ পর্যন্ত যিশু খ্রিস্টের অনুসারীদের কাছে নতি স্বীকার করল?
শুরুর দিকে রোমান ধর্ম ছিল ভীষণ বাস্তবমুখী। তাদের কোনো জটিল ধর্মতত্ত্ব ছিল না। তাদের ছিল গৃহদেবতা, লাহ (Lares) এবং পেনাটস (Penates)। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শস্যের গোলা, প্রতিটি জায়গার জন্য ছিল নির্দিষ্ট দেবতা।
কিন্তু রোম যখন তার সীমানা ছাড়িয়ে গ্রিস জয় করল, তখন তাদের ধর্মে এক বিশাল ‘কালচারাল শক’ বা সাংস্কৃতিক ধাক্কা লাগে। রোমানরা গ্রিকদের দর্শন ও শিল্পকলার প্রেমে পড়ে যায়। তারা গ্রিক দেবতাদের নাম বদলে রোমান ছাঁচে ঢালল। জিউস হলেন জুপিটার, আর অ্যারিস হলেন মার্স। এই Interpretatio Romana বা রোমান ব্যাখ্যা ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সরিয়ে রাজকীয় রূপ দান করল। বিশাল সব মার্বেল পাথরের মন্দির তৈরি হলো, যেখানে ধর্মের চেয়ে রাষ্ট্রের শক্তি বেশি প্রদর্শিত হতো।
২.সম্রাট স্বয়ং ঈশ্বর
রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সাথে সাথে একটি নতুন সংকটের উদ্ভব হলো। এত বিশাল এবং বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীকে এক সুতোয় বাঁধা যায় কীভাবে? সমাধান হিসেবে এলো ‘ইম্পেরিয়াল কাল্ট’।
অগাস্টাসের আমল থেকে সম্রাটকে শুধু একজন শাসক নয়, বরং দেবতুল্য বা ‘ডিভাইন’ হিসেবে উপস্থাপন করা শুরু হয়। সম্রাটকে পূজা করা তখন আর কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল না, বরং তা ছিল নাগরিক আনুগত্য বা দেশপ্রেমের পরীক্ষা।
সম্রাটকে দেবতা বানানোর এই রাজনৈতিক কৌশলের ওপর আধুনিক ইতিহাসবিদ মেরি বিয়ার্ড (Mary Beard) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Religions of Rome‘-এ লিখেছেন:
“রোমান সম্রাটদের দেবত্ব ঘোষণা করা কেবল এক ধরণের চাটুকারিতা ছিল না; এটি এমন এক ব্যবস্থা যা বিশাল এবং বিচিত্র এক সাম্রাজ্যকে একটি অভিন্ন আনুগত্যের সুতোয় গেঁথে রেখেছিল।”
কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় জাঁকজমকের ভিড়ে সাধারণ মানুষ একঘেয়ে হয়ে পড়ছিল। জুপিটার বা সম্রাটের পূজা তাদের মনের আধ্যাত্মিক ক্ষুধা মেটাতে পারছিল না।
৩
ঠিক এই সময়েই রোমে প্রবেশ করে প্রাচ্যের কিছু ‘মিস্ট্রি রিলিজিয়ন’ বা রহস্যময় ধর্ম। পারস্য থেকে আসা মিথ্রাইজম (Mithraism) সেনাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অন্যদিকে, মিশরীয় দেবী আইসিস (Isis)-এর পূজা মানুষকে পুনর্জন্ম এবং মমত্বের আশ্বাস দিত। এই ধর্মগুলো ছিল ব্যক্তিগত এবং আবেগপ্রবণ। যা প্রথাগত রোমান ধর্মে অনুপস্থিত ছিল।
৪.
যিশু এবং একটি রাজকীয় বিপ্লবযখন খ্রিস্টধর্ম প্রথম রোমে প্রবেশ করে, তখন একে দেখা হয়েছিল একটি অখ্যাত ইহুদি সম্প্রদায় হিসেবে। রোমানদের কাছে এটি ছিল বিপজ্জনক, কারণ খ্রিস্টানরা সম্রাটের মূর্তিতে ধূপ দিতে অস্বীকার করত। ফলে শুরু হয় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী নির্যাতনের ইতিহাস।
কিন্তু ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন যখন খ্রিস্টধর্মকে বৈধতা দিলেন, তখন ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেল। ৩৮০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াসের ঘোষণায় এটিই হয়ে দাঁড়াল সাম্রাজ্যের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ধর্ম। যে প্যাগানিজম বা পৌত্তলিকতা রোমের ভিত্তি গড়েছিল, তা হঠাত করেই ‘বেআইনি’ হয়ে পড়ল।
খ্রিস্টধর্মের এই অবিশ্বাস্য উত্থান সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এডওয়ার্ড গিবন (Edward Gibbon) তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘The Decline and Fall of the Roman Empire‘-এ লিখেছেন:
“খ্রিস্টধর্মের জয় কেবল এক ঈশ্বরবাদের জয় ছিল না, এটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের ভেতরে একটি নতুন এবং সুশৃঙ্খল সমাজের জন্ম যা পুরনো পৌত্তলিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।”
৫.
তবে রোমান ধর্ম কি পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল? উত্তর হলো, না। রোমান ধর্ম মরে যায়নি, বরং তা খ্রিস্টধর্মের শরীরের ভেতরে বসতি গেড়েছিল। রোমানদের ‘পন্টিফেক্স ম্যাক্সিমাস’ (প্রধান পুরোহিত) উপাধিটি পোপ গ্রহণ করলেন। শীতকালীন উৎসব ‘স্যাটারনালিয়া’র আনন্দ মিশে গেল বড়দিনের উৎসবে। এমনকি অনেক প্রাচীন মন্দিরের স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের ভ্যাটিকানের জাঁকজমক।
রোমের এই ধর্মীয় রূপান্তর কেবল বিশ্বাসের বদল ছিল না, এটি ছিল একটি মৃতপ্রায় প্রাচীন জগতের আধুনিক পৃথিবীতে টিকে থাকার শেষ লড়াই। আজ যখন আমরা প্রাচীন রোমের ধ্বংসাবশেষ দেখি, তখন সেখানে কেবল পাথর দেখি না, দেখি রোমানদের সেই আদিম আকুতিযা হাজার বছর ধরে অজানাকে জানার চেষ্টায় বারবার নিজের ঈশ্বর বদলেছে।