‘ভালনারেবিলিটি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ – আল পাচিনো

‘দ্য গডফাদার’-এর মাইকেল করলিয়নি থেকে ‘স্কারফেস’-এর টনি মন্টানা, প্রতিটি চরিত্রে আল পাচিনো নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন এক অদ্ভুত তীব্রতায়।
‘ভালনারেবিলিটি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ - আল পাচিনো
ILLUSTRATION BY ANGAN, IMAGE SOURCE: GETTY
Share on

নিউ ইয়র্কের ধুলোবালি মাখা রাস্তা থেকে উঠে আসা এক যুবক, যিনি সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক লিভিং লিজেন্ড; তিনি আল পাচিনো। ‘দ্য গডফাদার’-এর মাইকেল করলিয়নি থেকে ‘স্কারফেস’-এর টনি মন্টানা, কিংবা ‘সেন্ট অফ এ ওম্যান’-এর সেই অন্ধ লেফট্যানেন্ট কর্নেল, প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন এক অদ্ভুত তীব্রতায়। কিন্তু অগণিত পুরস্কার আর আকাশচুম্বী খ্যাতির আড়ালে মানুষটি আসলে কেমন?

এই সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন তার অর্জন, ক্যারিয়ারের ভুল সিদ্ধান্ত, খ্যাতির বিড়ম্বনা এবং অভিনয়ের প্রতি সেই আদিম ও অদম্য টান নিয়ে, যা তাকে আজও থামতে দেয়নি। মূল : দ্যা টক

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : মিস্টার আল পাচিনো, নিজের আকাশচুম্বী অর্জনের ভার আপনি কীভাবে বহন করেন?

আল পাচিনো : সত্যি বলতে, আমি ঠিক জানি না। বিষয়টাকে আসলে ওভাবে দেখাই হয় না। নিজের করা কাজগুলোকে কেবল ‘অর্জনের’ তালিকায় ফেলে বিচার করা কঠিন। আপনার কাছে সেগুলো শুধুই একেকটি চরিত্র, একেকটি আঁকা ছবি। ভাবুন তো, একজন অভিনেতা যদি বলেন, “আমি আর অভিনয় করতে চাই না কারণ আমার শেষ ছবির চেয়ে ভালো কিছু করা আর সম্ভব নয়। আমার এখনই থামা উচিত।” একেই বোধহয় বলে ‘বিশ্রামের তরী’তে গা ভাসানো। লোকে বলে ওটা নাকি করতে নেই। তবে আমি কিন্তু এর পক্ষেই! মানে, নিজের সাফল্যের ওপর ভর দিয়ে আয়েশ করা, মোটা অংকের চেক পকেটে পোরা আর অন্য কোনো পেশায় চলে যাওয়া, মন্দ কী! কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমি বারবার এই কাজটার কাছেই ফিরে আসতে চাই।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : নতুন কিছু করার তাড়না থেকেই কি এই ফিরে আসা?

আল পাচিনো : হ্যাঁ, যদি এমন কিছু খুঁজে পাই যেখানে আমার মনে হয় যে কিছু অবদান রাখার সুযোগ আছে, যেখানে নিজেকে ওই চরিত্রের অংশ বলে মনে হয়; তখনই মনে হয় আমি কিছু একটা বলছি। এই ‘বলা’র মানেটা আসলে কী? শেক্সপিয়রের ভাষায় বলতে গেলে, “প্রকৃতির সামনে একটি আয়না ধরা।” যদি এমন কিছু প্রকাশ করতে পারি যা আমার প্রতিভাকে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয় এবং একটি চরিত্রকে, একজন রক্ত-মাংসের মানুষকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে, তবে আমি তা করার চেষ্টা করব। আমি ‘অবসর’ শব্দটা উচ্চারণ করতে চাই না। একজন শিল্পীর মুখ থেকে ‘অবসর’ শব্দটা শোনা খুব অদ্ভুত শোনায়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আর্টিস্ট ক্রিস্টো বলতেন, শিল্পীরা অবসর নেন না, তারা কেবল মৃত্যুবরণ করেন।

আল পাচিনো : তবে এমন শিল্পীও আছেন যারা অবসর নিয়েছেন। যেমন ফিলিপ রথ, তাঁর বই ‘দ্য হাম্বলিং’ নিয়ে আমি একটি সিনেমা করেছিলাম। তিনি লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন এবং তিনি নাকি বেশ ভালো আছেন! অন্তত তিনি তেমনটাই বলেন। তিনি এখন নিজের মতো সময় কাটান। আমি সেটা বুঝতে পারি। কাজটা অনেক সময় একঘেয়ে হয়ে যায়। আপনাকে চিত্রনাট্য দেওয়া হবে, সেটা পড়তে হবে, মুখস্থ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনাকে আবারও যেতে হবে। তাই আপনি তখন ভিন্ন কিছু খোঁজেন, যেমন একজন পরিচালক যিনি আপনাকে পেতে চান…

‘ভালনারেবিলিটি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ - আল পাচিনো
বাঁ থেকে, আল পাচিনো, পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা এবং অভিনেতা মারলন ব্র্যান্ডো। ১৯৭২ সালের ‘দ্য গডফাদার’ ছবির সেটে কথা বলছেন। Photo by Steve Schapiro/Corbis via Getty Images

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : কিন্তু সব পরিচালকই তো নিশ্চয়ই আপনাকে পেতে চান।

আল পাচিনো : ‘দ্য গডফাদার’—প্রথম পর্বটার আগে কিন্তু কেউই আমাকে চাইত না। শুধু ফ্রান্সিস (ফোর্ড কপোলা) আমাকে চেয়েছিলেন! স্রেফ চেয়েছিলেন, আর আমি তার কারণটা বুঝতেই পারিনি… স্টুডিওগুলো আমাকে চাইছিল না, কেউ চাইছিল না; কেউ আমাকে চিনত পর্যন্ত না। আমার মনে হয়, যখন কোনো পরিচালক আমার ওপর আগ্রহ দেখান, আমি পিছিয়ে না গিয়ে বরং সামনে ঝুঁকে আসি। আপনি সবসময়ই এমন একটা ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ খোঁজেন, যেখানে আপনি আছাড় খেয়ে পড়বেন, আবার উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাবেন।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : কিন্তু কেন?

আল পাচিনো : যখন আপনি দীর্ঘ সময় ধরে এই কাজটা করবেন, তখন নিজেকে উন্মুক্ত রাখাটা জরুরি হয়ে পড়ে। আপনি নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইবেন না, কারণ সংবেদনশীলতা বা ‘ভালনারেবিলিটি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। গায়ের চামড়া খুব বেশি পুরু হতে দেওয়া ঠিক নয়। ব্রেখট তাঁর এক অসাধারণ নাটকে; যা তিনি মাত্র ২২ বছর বয়সে লিখেছিলেন, ‘ইন দ্য জঙ্গল অফ সিটিজ’—সেখানে একটি চরিত্র বলে, “এই পৃথিবীর জন্য মানুষের চামড়া বড্ড পাতলা।” তিনি দেখেছিলেন যে চামড়া সময়ের সাথে সাথে পুরু হতে থাকে, যতক্ষণ না মানুষ চারপাশের জিনিসে ধাক্কা খেতে শুরু করে এবং কিছুই অনুভব করতে পারে না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : নিজের সীমানাকে ভাঙার এই যে তীব্র ইচ্ছা, এর কারণে করা কোনো সিনেমার জন্য কি আপনি অনুতপ্ত?

আল পাচিনো : আমি কোনো কিছু নিয়ে অনুশোচনা করি না। আমার মনে হয় আমি এমন কিছু কাজ করেছি যেগুলোকে ‘ভুল’ বলা যায়। হয়তো ভুল ছবি বেছে নিয়েছি, কিংবা কোনো চরিত্রের গভীরে ঢুকিনি, অথবা অভিনয়ের ক্ষেত্রে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি… কিন্তু আপনি যা-ই করেন না কেন, তা আপনারই অংশ। আপনি সেখান থেকে কিছু না কিছু পান। এই যে বিভিন্ন পরিস্থিতি আর জায়গার মধ্যে থাকার উত্তেজনা; এগুলো কেবল স্মৃতি নয়, এগুলো আপনার জীবনকে সমৃদ্ধ করে। তাই আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : এমনকি ‘স্টার ওয়ার্স’ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যও না?

আল পাচিনো : স্টার ওয়ার্স। হ্যাঁ, ওটা ছিল আমার জীবনের প্রথম বড় ভুল।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আর টেরেন্স ম্যালিকের সেই চিত্রনাট্যটি?

আল পাচিনো : হ্যাঁ, অনেক দিন আগে টেরি আমাকে একটা সিনেমায় নিতে চেয়েছিল, আর আমি সবসময় আফসোস করি যে… ওটা আমার অজস্র ভুলের মধ্যে আরেকটি। আমার একটা ‘ভুলের জাদুঘর’ আছে! সেখানে আমার ফিরিয়ে দেওয়া সব চিত্রনাট্য জমা হয়ে আছে!

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আপনি বলছিলেন নিজেকে উন্মুক্ত রাখার কথা, চামড়া যেন বেশি পুরু না হয় সেই কথা। বর্তমান সময়ে আপনার অভিনয়ের দৃষ্টিভঙ্গি কি আগের চেয়ে আলাদা?

আল পাচিনো : হ্যাঁ, আমার ধারণা তা-ই। তা না হলে আমি এত লম্বা সময় টিকে থাকতে পারতাম না। জীবনের সাথে সাথে আমরা বিভিন্ন চক্রের মধ্য দিয়ে যাই এবং বয়স বাড়ার বিষয়টিও ঠিক তা-ই। আমরা এখানে আছি, আবার একদিন থাকব না! কখন চলে যাব তা আমরা কেউ জানি না। তাই আমাদের এই চক্রগুলোর মধ্য দিয়েই যেতে হয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : জীবনের এই বর্তমান পর্যায় বা চক্রটি কি আপনি উপভোগ করছেন?

আল পাচিনো : আসলে বিষয়টা হলো, গ্লাসটি অর্ধেক খালি নাকি অর্ধেক পূর্ণ? আমাদের সবার জন্যই বোধহয় জীবনটা এমনই। কিছু দিন এমন যায় যখন আমি সত্যিই উপভোগ করি। আবার কিছু দিন ঠিক তেমনটা হয় না… আমি যদি একজন চিত্রশিল্পী হতাম, তবে কেউ আমার বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলত না। আমি বলতাম, “আমি ছবি আঁকি! আমি একজন শিল্পী!” যদিও আমি এই শব্দটা বলতে ঘৃণা করি। এটা আমি খুব আগে শিখেছিলাম। একজনের সাথে আমি থাকতাম, তিনি বলতেন, “তুমি যা-ই করো না কেন, নিজেকে শিল্পী বলে পরিচয় দিও না।” আমি বলতাম, “আমি জানি! আমি বলি না!” (হাসি)। আমি এটা এড়িয়ে চলি। বহু বছর ধরে এড়িয়ে চলছি। এভাবে বলা যাক; আমি মনে করি আমি একজন শিল্পী। আমি আশা করি আমি একজন শিল্পী। তবে আমি যদি চিত্রশিল্পী হতাম, তবে প্রশ্নের ধরনটা হয়তো ভিন্ন হতো।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : কিন্তু সব অভিনেতাকেই তো একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

আল পাচিনো : এর কারণ হলো দৃশ্যমানতা। এটা আসলে ইমেজের ব্যাপার। আমাদের সবসময় আমাদের ইমেজের সাথে লড়াই করতে হয়, যদিও আমরা ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করি, কিন্তু সেই পরিচিত অবয়বটা সবসময় থেকেই যায়… তাই নিজেকে শিল্পী বলাটার মধ্যে এক ধরণের দেমাগ বা আভিজাত্যের ভান চলে আসে, কারণ দিনশেষে আপনি একজন ‘মুভি স্টার’। আর সেটাও ভুল! নিজেকে ‘মুভি স্টার’ বলাটাও তো এক ধরণের ভণ্ডামি! তাহলে ছাই আপনি, নিজেকে কী বলে পরিচয় দেবেন?

লেখক সম্পর্কে

কুমার বিশ্বনাথ অঙ্গন-এর একজন স্টাফ রাইটার

কুমার বিশ্বনাথ থেকে আরো

থেকে আরো

প্রাচ্যের কবি ডক্টর আল্লামা ইকবাল Angan

প্রাচ্যের কবি ডক্টর আল্লামা ইকবাল

আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে, যেখানে উগ্রবাদ আর বস্তুবাদ মানুষের আত্মাকে গ্রাস করছে, সেখানে ইকবালের দর্শন কি কেবল লাইব্রেরির তাকে সাজিয়ে রাখার

Scroll to Top