আল মাহমুদ : আধুনিক বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ

al mahmud on angan
Share on

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ (পুরো নাম: মির আবদুস শুকুর আল মাহমুদ) বাংলা সাহিত্যে এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সাহিত্যজীবন ও জীবনদর্শন বাংলা কবিতাকে এক নতুন মোড় দিয়েছে। প্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস, এবং জাতীয়তাবাদ—এই সবকিছু মিলে গঠিত হয়েছে তাঁর কাব্যভুবন।

জন্ম ও শৈশব
আল মাহমুদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে। তাঁর পিতা মীর আবদুস শুকুর এবং মাতা রওশন আরা। ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। স্থানীয় মক্তব ও মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা নেওয়ার পর তিনি সাধারণ পাঠ্যক্রমে পড়ালেখা চালিয়ে যান।

সাহিত্যজীবনের সূচনা
আল মাহমুদের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় কিশোর বয়সে। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে তাঁর কবিতা ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশ পেতে থাকে। খুব অল্প সময়েই তিনি কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর (১৯৬৩) প্রকাশের পরই বাংলা সাহিত্যে তিনি নিজস্ব এক কাব্যভাষা তৈরি করেন।

কাব্যভাবনা ও প্রধান কাব্যগ্রন্থসমূহ
আল মাহমুদের কাব্যভাষা ছিল খুবই ঘন, চিত্রময় ও গভীর ভাবসম্পন্ন। তিনি গ্রামীণ জীবনের প্রতি প্রেম, ঐতিহ্য ও ইসলামী ভাবধারাকে কবিতায় জায়গা দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:
লোক লোকান্তর (১৯৬৩)
কালের কলস (১৯৬৬)
সোনালি কাবিন (১৯৭৩)
মায়াবী পর্দা দুলে উঠো
আরব্য রজনীর রাজহাঁস
দ্বিতীয় ভাঙন

সোনালি কাবিন তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। এই কাব্যগ্রন্থে কবি প্রেম, নারীর শরীর, ও ধর্মীয় অনুভূতিকে অসাধারণভাবে মেলাতে পেরেছেন।

রাজনৈতিক জীবন ও মতাদর্শ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রগতিশীল চেতনার পক্ষে অবস্থান নিলেও, পরবর্তী জীবনে ইসলামপন্থী ভাবধারার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি ইসলামিক ভাবধারার সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন এবং পরবর্তীতে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি চিন্তাধারার প্রচারক হিসেবে দেখা দেন।

প্রবন্ধ, উপন্যাস ও ছোটগল্প
আল মাহমুদ কেবল কবিতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি প্রবন্ধ, ছোটগল্প এবং উপন্যাসেও ছিলেন সমান দক্ষ। তাঁর লেখা উপন্যাসসমূহ:

কবির মৃত্যু
উপমহাদেশ
ডারাই নদীর ধারে
রচনাসমগ্র (বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশিত)

পুরস্কার ও সম্মাননা
তাঁর সাহিত্যকীর্তির জন্য তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮)
একুশে পদক (১৯৮৭)
কালি ও কলম পুরস্কার

মৃত্যু
আল মাহমুদ ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যজগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

আল মাহমুদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এমন এক কবি, যিনি সাহসের সঙ্গে ভাষা ও ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁর কবিতা যেমন প্রেমে পূর্ণ, তেমনি সমাজ, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও তুলে ধরে। বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্থায়ীভাবে লেখা থাকবে।

লেখক সম্পর্কে

অঙ্গন থেকে আরো

আমাদের এক প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ - Angan

আমাদের এক প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: একটি প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর, একটি অমর রোমান্টিকতা“ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো” এক পরিচিত নাম, এক

থেকে আরো

পরিবারের ২১ জনকে হারিয়ে গাজার গল্পকে অমর করছেন আহমেদ আলনাউক

পরিবারের ২১ জনকে হারিয়ে গাজার গল্পকে অমর করছেন আহমেদ আলনাউক

গাজায় জন্ম, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী সাংবাদিক আহমেদ আলনাউক ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিজের ২০ জনেরও বেশি পরিবারের সদস্যকে হারিয়েছেন। তিনি একটি

Scroll to Top