রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: এক কবির জীবনের শতরঙা ছায়াচিত্র

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: এক কবির জীবনের শতরঙা ছায়াচিত্র Angan
Share on

যদি বলেন, বাংলা সাহিত্য কার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী—একটি নামই কানে বাজবে: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে তিনি শুধু কবি নন। তিনি যেন এক সত্তা—যাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল সঙ্গীত, শিল্প, দর্শন, প্রেম, প্রতিবাদ, ও মানবতা। তাঁর কলমে ফুটে উঠেছে মানুষের গভীরতম আবেগ, প্রকৃতির মর্মসন্ধান, ও বিশ্বচেতনায় বিশ্বাস।
একটা জীবন যা কখনও সাহিত্য, কখনও গান, কখনও শিক্ষা, আবার কখনও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল।

জন্ম ও শৈশব: কাব্যিক এক সূচনা
১৮৬১ সালের ৭ই মে, কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। এক সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী পরিবারে জন্ম নিয়ে ছোটবেলা থেকেই তিনি গড়ে উঠেছিলেন এক স্বতন্ত্র মানসিকতায়।
বাড়ির চারপাশে ছিল সংগীত, নাটক, সাহিত্য, ধর্ম ও দার্শনিক চর্চার এক অনন্য পরিবেশ। পুঁথিগত বিদ্যার বেড়াজাল ভালো লাগেনি রবির। বরং প্রকৃতি, ভাবনা, ও নিজের চিন্তার জগতে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

সাহিত্য জীবনের যাত্রা: যখন শব্দ হয়ে ওঠে আত্মা
মাত্র ১৬ বছর বয়সে “ভানুসিংহ” ছদ্মনামে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম কবিতা। এরপর একের পর এক সৃষ্টি—‘সোনার তরী’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘শেষের কবিতা’, ‘গীতাঞ্জলি’—প্রেম, দর্শন, দেশপ্রেম, আত্মজিজ্ঞাসা, আর বিশ্বমানবতার এক অপূর্ব কাব্যিক উপাখ্যান।

বিশ্ববাসীর হৃদয় ছুঁয়ে যায় তাঁর লেখা। ১৯১৩ সালে, ‘গীতাঞ্জলি’-র ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি পান নোবেল সাহিত্য পুরস্কার—প্রথম এশীয় হিসেবে। বিশ্ব তখন জানতে শেখে এক নতুন কণ্ঠস্বর—যে পূর্বের আলোকে পাশ্চাত্য মনন জাগাতে পারে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত: হৃদয়ের সুর
তাঁর গান—রবীন্দ্রসঙ্গীত—হয়তো বাংলা সংস্কৃতির আত্মা। প্রেম, বেদনা, পূজা, প্রকৃতি, আর দেশপ্রেম—সব অনুভবই তিনি গানে গানে গেঁথেছেন।
আজও, সকালবেলার ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ থেকে শুরু করে একলা পথচলার ‘একলা চলো রে’—তাঁর সুরগুলো শুধু গান নয়, বাঙালির জীবনের আবহ।

চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ
প্রায় ৬৭ বছর বয়সে, রবীন্দ্রনাথ হাতে তুলে নেন তুলি। তাঁর আঁকা ছবি ছিল আধুনিকতায় পূর্ণ, বিমূর্ত ও অভিব্যক্তিশীল। ইউরোপের আর্ট গ্যালারিগুলিতেও তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে।
এই মানুষটি যেন চিরন্তন শিখরে পৌঁছাতে জানতেন—যে পথই হোক না কেন।

শিক্ষার নতুন দিগন্ত: শান্তিনিকেতনের স্বপ্ন
একটি ‘খোলা আকাশের নিচে বিদ্যালয়’—এই ভাবনায় ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন। পরে ১৯২১-এ সেটি রূপ নেয় বিশ্বভারতীতে—এক আন্তর্জাতিক মানসিকতা সম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সংস্কৃতি ও জ্ঞান মিলেমিশে এক বিশ্বজোড়া পরিবার গড়ে তোলে।

Rabindranath Tagore at work in his study at Santiniketan. Photo: Wikimedia Commons
Rabindranath Tagore at work in his study at Santiniketan. Photo: Wikimedia Commons


প্রতিবাদ ও রাজনীতি: কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এক কবি
যদিও তিনি রাজনীতিক ছিলেন না, তবুও তাঁর কলম ছিল প্রতিবাদের ধারালো অস্ত্র। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ত্যাগ করেন ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড। তাঁর সেই চিঠি ছিল নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তিনি ছিলেন ‘দেশপ্রেমিক’—কিন্তু সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরোধী। তাঁর দর্শন ছিল বিশ্বমানবতার, সার্বজনীনতায় বিশ্বাস।

১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট, জোড়াসাঁকোতেই পরিণতি পায় রবীন্দ্রজীবনের মহাকাব্য। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি—তাঁর গান, কবিতা, নাটক, ছবি—আজও বেঁচে আছে আমাদের হৃদয়ে, আমাদের ভাষায়, আমাদের চেতনায়।
দুই দেশের জাতীয় সংগীত তাঁর কলমেরই সৃষ্টি—‘জনগণমন’ (ভারত) ও ‘আমার সোনার বাংলা’ (বাংলাদেশ)—আর কী চাই একজন কবির জীবন থেকে?

এখনও আমরা তাঁর আলোয় হাঁটি
রবীন্দ্রনাথের জীবন মানে কেবল পুরস্কার বা খ্যাতি নয়। তাঁর জীবন মানে প্রশ্ন করার সাহস, ভালোবাসার গভীরতা, প্রকৃতির প্রতি টান, ও মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ আস্থা।
আজও যখন গ্রীষ্মে ‘বৃষ্টির গান’ শুনি, কিংবা বসন্তে ‘ফাগুনের গন্ধ’ পাই, মনে হয়—রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাথেই আছেন।

লেখক সম্পর্কে

অঙ্গন থেকে আরো

আমাদের এক প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ - Angan

আমাদের এক প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর : রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: একটি প্রতিরোধী কণ্ঠস্বর, একটি অমর রোমান্টিকতা“ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো” এক পরিচিত নাম, এক

থেকে আরো

পরিবারের ২১ জনকে হারিয়ে গাজার গল্পকে অমর করছেন আহমেদ আলনাউক

পরিবারের ২১ জনকে হারিয়ে গাজার গল্পকে অমর করছেন আহমেদ আলনাউক

গাজায় জন্ম, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী সাংবাদিক আহমেদ আলনাউক ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিজের ২০ জনেরও বেশি পরিবারের সদস্যকে হারিয়েছেন। তিনি একটি

Scroll to Top