হাতে হুক্কার নল, কিন্তু মন পড়ে আছে জিব্রাঈলের সেই ডানার প্রান্তসীমায়, যেখানে সিদরাতুল মুনতাহায় এসে খোদার দূতকে থমকে যেতে হয়েছিল। হুক্কার মৃদু গুড়গুড় শব্দ আর ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাপিয়ে তাঁর ভাবনার অলিগলি আজ এক মহাজাগতিক প্রশ্নের মুখোমুখি; কী সেই ‘রাজো-নেয়াজ’ বা গোপন আলাপ, যা সিদরাতুল মুনতাহার ওপারে খোদা ও তাঁর প্রিয় মেহমানের মধ্যে হয়েছিল?
তিনি আর কেউ নন, ডক্টর আল্লামা মোহাম্মদ ইকবাল। যাকে আজ আমরা ‘মুফাক্কির-এ-পাকিস্তান’, ‘হাকিম-উল-উম্মত’ এবং ‘শায়ের-এ-মাশরিক’ বা প্রাচ্যের কবি বলে চিনি। কিন্তু ইকবালের এই পরিচিতি কেবল ইতিহাসের পাতায় বা পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল হাজারো পরতে মোড়ানো। একদিকে তিনি সুফি-সাধক, অন্যদিকে তুখোড় আইনজীবী; একদিকে বিরহী প্রেমিক, অন্যদিকে আধুনিক দর্শনের কঠোর সমালোচক।

পৃথিবীর বেশিরভাগ মহৎ মানুষের মতোই ইকবালের জীবন ছিল বৈপরীত্যে ঠাসা। তাঁর মাজারের ওপর আজ শ্রদ্ধার চাদর চড়ানো হয় ঠিকই, কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে যেমন ‘অলি-উল্লাহ’ বা আল্লাহর বন্ধু ভাবা হতো, তেমনই ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘স্যার’ খেতাব গ্রহণ করার জন্য তাঁকে তোপও দাগানো হয়েছিল। কেউ কেউ তাঁকে ধর্মদ্রোহী বা ‘কাফের’ বলে ফতোয়া দিতেও ছাড়েনি। অথচ সেই একই মানুষটি কুরআন পড়ার সময় আবেগে এতটাই আপ্লুত হতেন যে, তাঁর চোখের পানিতে গাল ভিজে যেত।
মুসা (আ.) খোদার সাথে কথা বলেছিলেন তুর পাহাড়ে গিয়ে, আর ইকবালের কলম নিজেই যেন হয়ে উঠেছিল এক ‘কলম’ বা বাক্যালাপের মাধ্যম। তাঁর কবিতায় স্রষ্টার সাথে যে মান-অভিমান, যে ‘শিকওয়া’ এবং ‘জওয়াব-এ-শিকওয়া’ দেখা যায়, তা কোনো সাধারণ কবির কল্পনা হতে পারে না। এটি ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস দেখুন, যে মানুষটি মুসলমানদের হৃদয়ে ঈমানের আগুন জ্বালাচ্ছিলেন, তাঁকেই সমসাময়িক রক্ষণশীল সমাজের কুফরি ফতোয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল।

ইকবালের জীবনযাত্রার একটা বড় অংশজুড়ে ছিল ইউরোপ। ১৯০৫ সালে তিনি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি এবং ইংল্যান্ডে যান, তখন তাঁর সামনে এক নতুন জগত উন্মোচিত হয়। তিনি নিৎসে, হেগেল এবং কান্টের মতো নাস্তিক্যবাদী বা যুক্তিবাদী দার্শনিকদের দর্শন কেবল পড়তেন না, বরং গিলে ফেলতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইউরোপের এই চাকচিক্য এবং যান্ত্রিক সভ্যতা তাঁকে মোহিত করার বদলে বিমুখ করেছিল।
তিনি লিখেছিলেন:
“মেশিনের শাসন হৃদয়ের জন্য মৃত্যুস্বরূপ, এটি সহমর্মিতার অনুভূতিকে পিষে ফেলে।”
ইউরোপীয় সমাজের বস্তুবাদ এবং আধ্যাত্মিক শূন্যতা তাঁকে ব্যথিত করত। তাঁর কাছে মনে হতো, পশ্চিমা জগত শরীর গড়তে জানে, কিন্তু আত্মা হারিয়ে ফেলেছে। তবুও এই ইউরোপেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণা। হাইডেলবার্গের নেকার নদীর তীরে এমা ওয়েগেনাস্ট নামক সেই উজ্জ্বল চোখের জার্মান তরুণীকে।

ইকবালের রোমান্টিক জীবন ছিল তাঁর কবিতার মতোই গভীর এবং ট্র্যাজিক। শিয়ালকোটের সেই রক্ষণশীল পরিবেশে বড় হওয়া বালকটি যখন কিশোর বয়সেই করিম বিবির সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন, তখন তিনি জানতেনও না যে বিয়ে কী। সেই দাম্পত্য জীবনে মানসিক সখ্যতা গড়ে ওঠেনি। পরবর্তীকালে সর্দার বেগম এবং মোখতার বেগমের সাথে তাঁর সম্পর্কগুলো ছিল সামাজিক এবং পারিবারিক বাধ্যবাধকতার এক মিশ্রণ।
সর্দার বেগমকে ঘরে তোলার পেছনেও ছিল দীর্ঘ মান-অভিমানের পালা। কিন্তু এক সময় এই নারীই ইকবালের সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী হিসেবে স্থান করে নেন। তবে ইকবালের হৃদয়ের এক কোণে সবসময় জ্বলত এমা ওয়েগেনাস্টের জন্য এক গোপন আগুনের শিখা। হাইডেলবার্গের সেই দিনগুলো তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর চিঠিগুলোতে দেখা যায়, তিনি এমাকে লিখছেন, “অনুগ্রহ করে এই বন্ধুটিকে ভুলো না, যে তোমাকে সবসময় হৃদয়ে ধারণ করে।” জার্মান কবি গ্যেটেকে বোঝার তাড়না আর এমার সান্নিধ্য, এই দুই মিলে ইকবালের ভেতরে এক অদ্ভুত দার্শনিক দহন তৈরি করেছিল।

ইকবালের দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ‘খুদি’ (Selfhood) বা আত্মসত্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন নিজের আত্মাকে চিনতে পারে, তখন সে ভাগ্যের দাসে পরিণত হওয়ার বদলে নিজের ভাগ্য নিজেই লিখতে পারে। তিনি ভারতীয় মুসলমানদের আলস্য এবং পরাধীনতার গ্লানি দেখে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হতেন। মুসলমানদের খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থা দেখে তিনি আক্ষেপ করতেন:
“Firqa Bandi Hai Kahin, Aur Kahin Zaatain Hain
Kya Zamane Mein Panapne Ki Yehi Baatain Hain?
অর্থ : ফেরকাবন্দি আছে কোথাও, কোথাও আছে জাতের বড়াই; এভাবেই কি তোমরা জামানায় টিকে থাকতে চাও?”
তিনি ডাক দিয়েছিলেন নীল নদের তীর থেকে কাশগড় পর্যন্ত সমস্ত মুসলমানকে এক দেহের মতো হওয়ার জন্য। তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরে আসত ‘শাহীন’ বা ঈগল পাখির উপমা। শাহীন এমন এক পাখি, যে অন্যের তৈরি করা বাসায় থাকে না, যে আকাশের উচ্চতায় ওড়ে এবং প্রতিকূলতাকে জয় করে। তিনি চেয়েছিলেন মুসলিম তরুণরা যেন শাহীনের মতো সাহসী এবং স্বনির্ভর হয়।

ইকবালের চিন্তাভাবনা কেবল আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ অধিবেশনে তিনি যখন উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম প্রধান এলাকাগুলোকে নিয়ে একটি আলাদা রাষ্ট্রের প্রস্তাব দেন, তখন অনেকে একে কবির কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। হুক্কার ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে তিনি যে মানচিত্রটি দেখতেন, সেটিই পরবর্তীতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠকে তিনি যখন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দেখলেন, তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই মানুষটিই পারেন তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। জিন্নাহ যখন রাজনীতি ছেড়ে লন্ডনে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন ইকবালই তাঁকে চিঠির পর চিঠি লিখে ভারতে ফিরিয়ে এনেছিলেন। জিন্নাহ পরবর্তীকালে বলেছিলেন, যদি তাঁকে বলা হয় যে আপনি দেশের শাসনভার নেবেন নাকি ইকবালের কালাম (কবিতা), তিনি ইকবালের কালামকেই বেছে নেবেন।
কায়েদে আজম, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ; ইকবাল সম্পর্কে আরো বলেছিলেন- “স্যার ইকবাল নিঃসন্দেহে সর্বকালের মানবজাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, দার্শনিক এবং দূরদর্শী পুরুষ ছিলেন। তিনি দেশের রাজনীতিতে এবং মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্য ও চিন্তাধারায় তাঁর অবদান চিরকাল বেঁচে থাকবে।”

ইকবাল কেবল উর্দু ভাষার কবি ছিলেন না, তাঁর ফারসি কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁকে ইরান এবং আফগানিস্তানেও অমর করে রেখেছে। ইরানে তাঁকে ‘ইকবাল-এ-লাহোরি’ বলা হয় এবং তাঁর কবিতা আধুনিক ইরানের জাগরণে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তুরস্কের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল রুহানি। তিনি মাওলানা রুমিকে নিজের আধ্যাত্মিক গুরু মানতেন। তুরস্ক সরকার ইকবালের এই অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে মাওলানা রুমির কবরের পাশে ইকবালের একটি প্রতীকী কবর তৈরি করেছে।

১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল। ফজরের আজানের সুর যখন আকাশে ভেসে আসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ইকবালের আত্মা তাঁর প্রিয় স্রষ্টার সান্নিধ্যে পাড়ি জমায়। তিনি লিখেছিলেন, যা ছিল তাঁর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি:
“এই জান্নাত বোকাদের উপর মোবারক হোক, আমি তো আপনার সরাসরি সাক্ষাৎ চাই।”
বাদশাহী মসজিদের প্রবেশদ্বারের কাছে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে পুরো ভারত তথা মুসলিম বিশ্ব শোকাতুর হয়ে পড়েছিল। জিন্নাহ তাঁর চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছিলেন, আজ আমরা আমাদের সবচেয়ে বড় পথপ্রদর্শককে হারালাম।

আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে, যেখানে উগ্রবাদ আর বস্তুবাদ মানুষের আত্মাকে গ্রাস করছে, সেখানে ইকবালের দর্শন কি কেবল লাইব্রেরির তাকে সাজিয়ে রাখার জন্য? মোটেও না। ইকবাল আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে আধুনিক শিক্ষার সাথে আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় ঘটাতে হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন ‘খুদি’র শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের আসন দখল করতে।
ইকবাল নেই, কিন্তু তাঁর হুক্কার সেই ধোঁয়া থেকে তৈরি হওয়া স্বপ্নটি আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবার জন্য তাঁর বার্তা ছিল স্পষ্ট: নিজের গন্তব্য নিজে তৈরি করো। তাঁর সেই বিখ্যাত দোয়া আজও প্রতিটি শিশুর মুখে মুখে ফেরে:
“Lab Pe Aati Hai Duwa Banake Tamanna Meri,
Jindagi Shamma Ki Surat Hai, Khudaaya Meri
অর্থ : আশা হয়ে আমার ঠোঁটে আসে এই দোয়া,
জীবন যেন হয় আমার সফল হে খোদা।
মূল : রাফতার



