১৮ জুন ১৮১৫। ওয়াটারলুর (Battle of Waterloo) কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের রণক্ষেত্রের চারোদিকে ইউরোপের সম্মিলিত শক্তির বাহিনী, উদ্দেশ্য একটাই সামনে থাকা শত্রুকে গোঁড়া থেকে পরাস্ত করা।
অন্য দিকে তাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন। সাধারণ ধূসর রঙের ওভারকোটে ইতিহাসের এক অনন্য মহানায়ক, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তার মতে, “অসম্ভব শব্দটি কেবল বোকাদের অভিধানে পাওয়া যায়।”
যৌথভাবে তাকে পরাজিত করতে এসেছেন ব্রিটিশ বাহিনীর প্রধান ডিউক অব ওয়েলিংটন (Arthur Wellesley, Duke of Wellington) এবং প্রুশীয় সেনাপতি গাবার্ড ফন ব্লুচার (Gebhard von Blücher)।
স্বয়ং সেনাপ্রধান ডিউক অফ ওয়েলিংটনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তৎকালীন সময়ের সেরা সেনাপতি কে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “এই যুগে, গত যুগে বা যেকোনো যুগে; তিনি হলেন নেপোলিয়ন।”
তো, কে এই নেপোলিয়ন বোনাপার্ট?
১.
নেপোলিয়নের জন্ম ১৭৬৯ সালে, কর্সিকায়। ফরাসি বিপ্লবের ডামাডোলের মধ্যে তিনি যখন প্যারিসে সামরিক শিক্ষা নিচ্ছিলেন, তখন কেউ ভাবেনি এই ছেলেটিই একদিন ইউরোপের মানচিত্র নতুন করে আঁকবে। ১৭৯৫ সালে প্যারিসের রাস্তায় এক রাজকীয় বিদ্রোহ দমনে তার সেই বিখ্যাত “Whiff of Grapeshot” বা কামানের গোলা বর্ষণ তাকে রাতারাতি ফরাসি সরকারের রক্ষাকর্তায় পরিণত করে।
২.
নেপোলিয়ন কেন ইতিহাসের সেরা সেনাপতি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ১৮০৫ সালের ‘ব্যাটল অফ অস্টারলিটজ’। একে বলা হয় ‘তিন সম্রাটের যুদ্ধ’। একদিকে ছিলেন নেপোলিয়ন, অন্যদিকে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার সম্মিলিত বিশাল বাহিনী।
নেপোলিয়ন জানতেন তার সৈন্যসংখ্যা কম। তাই তিনি এক অদ্ভুত চাল চাললেন। তিনি ইচ্ছে করে তার ডান দিকের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে রাখলেন। শত্রু পক্ষ ভাবল এটাই সুযোগ! তারা তাদের মূল শক্তি নিয়ে সেই দুর্বল দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠিক তখনই নেপোলিয়ন তার আসল তলোয়ার বের করলেন। মাঝখানের কুয়াশা ঢাকা পাহাড় থেকে তার রিজার্ভ ফোর্স নিয়ে শত্রুর বুক চিরে দুই ভাগ করে দিলেন। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ইউরোপের দুই বড় শক্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।
ডিউক অফ ওয়েলিংটন একবার বলেছিলেন,“রণক্ষেত্রে নেপোলিয়নের উপস্থিতি মানেই অতিরিক্ত ৪০ হাজার সৈন্যের সমান শক্তি।”
নেপোলিয়নের একমাত্র দুর্বলতা জোসেফাইন। নেপোলিয়ন যখন পুরো ইউরোপ কাঁপাচ্ছেন, তখন ঘরের ভেতর তিনি ছিলেন একজন বিরহী প্রেমিক।
কিন্তু নেপোলিয়ন কেবল একজন যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত রাষ্ট্রনায়ক। তার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত রণক্ষেত্রে নয়, বরং আইনের পাতায়। আজও বিশ্বের বহু দেশের বিচারব্যবস্থা তার প্রবর্তিত আইন ব্যবস্থা ‘নেপোলিয়ন কোড‘ এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন: “তিনি (নেপোলিয়ন) ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে মহান সেই ব্যক্তিদের একজন, যারা আমাদের ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছেন।” শুধু তাই নয়, চার্চিল নেপোলিয়নকে এতোটাই শ্রদ্ধা করতেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার যখন প্যারিস দখল করে নেপোলিয়নের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যান, চার্চিল বলেছিলেন- “যুদ্ধ শেষ হলে আমি নিজে সেখানে গিয়ে সেই মহান যোদ্ধার প্রতি মাথা নত করব।”
৩.
নেপোলিয়ন ছিলেন একাধারে একজন দয়ালু এবং একজন স্বৈরশাসক। তিনি যখন ইতালিতে প্রবেশ করেন, তখন তাকে দেখা হয়েছিল স্বাধীনতার অগ্রদূত হিসেবে। কিন্তু সেই নেপোলিয়নই আবার ১৮০৪ সালে পোপের হাত থেকে মুকুট কেড়ে নিয়ে নিজের মাথায় পরেছিলেন, যা ছিল তার অসীম দম্ভের বহিঃপ্রকাশ। তিনি যেমন শিল্পকলা ও বিজ্ঞানকে ভালোবেসেছিলেন, তেমনি ক্ষমতার লোভে লাখ লাখ মানুষের রক্ত ঝরাতেও দ্বিধাবোধ করেননি।
বিখ্যাত রুশ লেখক লিও তলস্তয় তার উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস‘-এ নেপোলিয়নকে একজন অহংকারী ও ভাগ্যতাড়িত মানুষ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
দার্শনিক আলবেয়ার কামু নেপোলিয়নকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- “নেপোলিয়ন ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি বিশ্বকে নিজের ইচ্ছার অধীনে আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার শিকার হন।”
অন্যদিকে দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিৎশে নেপোলিয়নকে বলতেন “সুপারম্যান” বা ‘উবারমেনশ’-এর একটি বাস্তব রূপ। তার মতে, নেপোলিয়ন ছিলেন মানুষের অসীম সম্ভাবনার প্রতীক।
৪.
১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন যখন মিশরে যান, তার উদ্দেশ্য কেবল যুদ্ধ ছিল না, ছিল এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। তাই নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন ১৬০ জন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এবং চিত্রশিল্পী।
নেপোলিয়নের এই অভিযানের ফলেই আবিষ্কৃত হয় বিখ্যাত ‘রোজেটা স্টোন’ (Rosetta Stone), যা ছাড়া প্রাচীন মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপির অর্থ উদ্ধার করা অসম্ভব ছিল। সেই হিসেবে বলা যায় আধুনিক ‘ইজিপ্টোলজি’ বা মিশরবিদ্যার জনক আসলে নেপোলিয়নই।
৫.
নেপোলিয়নের একমাত্র দুর্বলতা জোসেফাইন। নেপোলিয়ন যখন পুরো ইউরোপ কাঁপাচ্ছেন, তখন ঘরের ভেতর তিনি ছিলেন একজন বিরহী প্রেমিক। তার স্ত্রী জোসেফাইন ছিলেন তার জীবনের ধ্রুবতারা। যুদ্ধের ময়দান থেকে তিনি জোসেফাইনকে যে চিঠিগুলো লিখতেন, সেগুলো আজ বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
একটি চিঠিতে নেপোলিয়ন লিখেছিলেন: “আমি এক মুহূর্তও তোমাকে না ভালোবেসে কাটাই না… আমার আত্মা তোমার হৃদয়ে বাস করে।”
কিন্তু এই প্রেমের গল্পে ট্র্যাজেডিও ছিল। সম্রাটের উত্তরাধিকারী প্রয়োজন ছিল, কিন্তু জোসেফাইন সন্তান দিতে পারছিলেন না। রাজনীতির চাপে পড়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ১৮১০ সালে নেপোলিয়ন তাকে ডিভোর্স দেন। কিছু সূত্রে, জোসেফাইনের নাম মুখে নিয়েই ১৮২১ সালে সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়েছিল।
৬.
নেপোলিয়ন তার সামরিক জীবনে প্রায় ৬০টিরও বেশি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যার অধিকাংশতেই তিনি জয়ী হন। যদি নেপোলিয়নের জীবন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর কথা বলতে হয় তো প্রথমই আসে-
- ১৭৯৬ সালে অস্ট্রিয়ায় লোদি-র যুদ্ধে নেপোলিয়নের সামরিক প্রতিভার প্রথম বড় প্রকাশ ঘটে।
- তারপর, ১৭৯৮ সালে মিশরে পিরামিডের যুদ্ধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ফরাসি আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে নেপোলিয়ন।
- ১৮০০ সালে অস্ট্রিয়ায় ম্যারেঙ্গোর যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে ইতালিতে ফরাসি নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনেন নেপোলিয়ন।তবে, নেপোলিয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় (Masterpiece) হিসেবে পরিচিত।
- ১৮০৫ এর রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার অস্টারলিটজ-এর যুদ্ধ।
- ১৮০৭ সালে ফ্রিডল্যান্ড-এর যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়াকে শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করেন নেপোলিয়ন।
পরাজিত যুদ্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে,
- ১৭৯৮ সালে নীল নদে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। যেখানে ফরাসি নৌবহর ধ্বংসের মাধ্যমে তাকে পরাজিত করেন ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল নেলসন।
- ১৮০৫ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে ট্রাফালগার-এর যুদ্ধ।
- ১৮০৫ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বোরোডিনো-র যুদ্ধ। কারিগরিভাবে জয়ী হলেও এটি ছিল এক রক্তক্ষয়ী বিজয়, যা নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
- ১৮১৩ সালে রাশিয়া, প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়ার (‘ব্যাটল অফ নেশনস) বিরুদ্ধে লাইপজিগ-এর যুদ্ধ। এখানে হারার পর তিনি প্রথমবার ক্ষমতা হারান।
- এবং সর্বশেষ ১৮১৫ সালে ব্রিটেন ও প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে ওয়াটারলু-র যুদ্ধ এটিই ছিল তার জীবনের শেষ যুদ্ধ। এই পরাজয়ের পর তাকে চিরস্থায়ী নির্বাসনে পাঠানো হয়।
নেপোলিয়নের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ১৮১২ সালের রাশিয়া অভিযান। ৬ লক্ষ সৈন্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সেই ‘গ্র্যান্ড আর্মি’ যখন ফিরে আসে, তখন অবশিষ্ট ছিল মাত্র হাজার দশেক। রাশিয়ার কনকনে শীত আর স্কর্চড আর্থ (Scorched Earth) পলিসি নেপোলিয়নের অপরাজেয় মিথটিকে চিরতরে ভেঙে দেয়।
তার পতনকে ইঙ্গিত করে ভিক্টর হুগো বলেছিলেন: “ঈশ্বর নেপোলিয়নে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন।”
ইতিহাসে তাকে এক মহানায়ক হিসেবে দেখা হয়। অথচ, ইতিহাস নিয়ে নেপোলিয়ন বলেছিলেন “ইতিহাস হলো এমন কিছু মিথ্যে গল্প, যা নিয়ে সবাই একমত হয়েছে।”
৭.
১৮ জুন ১৮১৫ তে ওয়াটারলুর পরাজয়ের পর ব্রিটিশ সরকার তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের এক নির্জন দ্বীপ সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিত করে। সেখানে একাকী বসে তিনি বই পড়ে, বাগান করে আর নিজের স্মৃতি রোমন্থন করে এবং জীবনস্মৃতি লিখে সময় কাটাতে লাগলেন।
১৮২১ সালের ৫ মে, আটলান্টিক মহাসাগরের এই জনমানবহীন দ্বীপে নেপোলিয়ন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অফিসিয়াল রিপোর্টে ডাক্তাররা বলেছিলেন তিনি ‘পাকস্থলীর ক্যান্সারে’ মারা গেছেন। উল্লেখ্য, তার বাবাও এই রোগেই মারা গিয়েছিলেন।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে নেপোলিয়নের চুলের নমুনা পরীক্ষা করে তাতে অস্বাভাবিক মাত্রায় আর্সেনিক (এক ধরণের বিষ) পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন, ব্রিটিশরা বা তার কাছের কেউ তাকে ধীরে ধীরে বিষ দিয়ে মেরে ফেলেছে।
মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ প্যারিসে ফিরিয়ে আনা হয় এবং সসম্মানে সমাধিস্ত করা হয়।
সূত্র মতে, এই মহানায়কের মৃত্যুর আগে তার মুখ থেকে বের হওয়া শেষ তিনটি শব্দ ছিল “France, l’armée, Joséphine” (ফ্রান্স, সেনাবাহিনী, জোসেফাইন)।
লাভ কামস ইন মেনি ওয়েজ।
সূত্র
- The Napoleon Series: নেপোলিয়ন যুগের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল আর্কাইভ।
- Fondation Napoléon: প্যারিস ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি নেপোলিয়নের ৪০০০-এর বেশি চিঠিপত্র এবং মূল নথিপত্র অনলাইনে সরবরাহ করে।
- বই: “Napoleon: A Life” (এন্ড্রু রবার্টস): এটি আধুনিক সময়ের সবচেয়ে প্রশংসিত জীবনী। লেখক নেপোলিয়নের কয়েক হাজার ব্যক্তিগত চিঠি পড়ে এটি লিখেছেন।
- ব্রিটিশ মিউজিয়াম: নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের সময়কার দুষ্প্রাপ্য নিদর্শনের জন্য।
- Napoleon.org: এখানে নেপোলিয়নের জোসেফাইনকে লেখা মূল চিঠিগুলো পড়তে পারবেন।
- “The Campaigns of Napoleon” by David Chandler: রণকৌশল বোঝার জন্য এটিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বই।
- বিবিসি হিস্ট্রি (BBC History): নেপোলিয়নের উত্থান ও পতনের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের জন্য।
- The Rosetta Stone – British Museum: নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের বৈজ্ঞানিক প্রভাব জানতে।
- “The Murder of Napoleon” by Ben Weider: আর্সেনিক বিষপ্রয়োগের তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত গবেষণামূলক বই।
- History Extra – BBC: নেপোলিয়নের জীবনের শেষ দিনগুলোর সঠিক ইতিহাসের জন্য।
- “Napoleon’s Egypt: Invading the Middle East” by Juan Cole: রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মিশর অভিযানের বিশ্লেষণ।