সুফিবাদ থেকে পপ কালচারে কাওয়ালি

তেরোশ শতাব্দীর দিল্লির সুলতানি আমল থেকে আজ অবধি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে কাওয়ালি ও তার ঐতিহ্য।
সুফিবাদ থেকে পপ কালচারে কাওয়ালি Angan

Illustration by Angan / Kazi Sayeed Mahmud

Share on

তেরোশ শতাব্দীর দিল্লির সুলতানি আমল থেকে আজ অবধি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে কাওয়ালি ও তার ঐতিহ্য। আজ কাওয়ালির এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনের গল্পটা জানবো। যেখানে রয়েছে কিছু অসামান্য মানুষের সাধনা, ত্যাগ ও এক অনন্য জীবনদর্শন।

“মজলিস আল-উশাক”-এর একটি পাণ্ডুলিপি থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রাকৃতির চিত্রে আমির খসরু তাঁর শিষ্যদের শিক্ষা দিচ্ছেন। সূত্র : সুলতান হুসেন বায়কারা

খসরুর কলমে কাওয়ালি

​কাওয়ালির শিকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষে। দিল্লির সুলতানি আমলের ধুলোমাখা পথে। এর মূল স্থপতি ছিলেন হযরত আবুল হাসান ইয়ামিন উদ-দিন খসরু (১২৫৩ – ১৩২৫) সহজ পরিচয়ে আমির খসরু, তবে মানুষ তাকে অনেক নামে চেনে। যেমন ধরেন, তুতিয়ে রাসুল, মালিকুশ শুআরা, তুতিয়ে হিন্দ, শামসুল আশেকীন, বুরহানুল মাসাকীন, রূহে রাসুল, আশেকে সাদেক, সওতুল হিন্দ। আর ভারতে তাকে বলা হয় ‘তুত-ই-হিন্দ’ তথা ভারতের তোতাপাখি। খসরু কেবল একজন কবি বা সংগীতজ্ঞই ছিলেন না, ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সবচেয়ে প্রিয় মুরিদ। কথিত আছে, খসরু যখন তার পীরের কাছে আসতেন, তখন শব্দ আর সুর ছাড়া তার মনে আর কিছুই থাকতো না। সেই সময়ে ভারতে প্রচলিত ছিল জটিল শাস্ত্রীয় সংগীত, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে ছিল। খসরু চাইলেন এমন কিছু তৈরি করতে, যা সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলবে, কিন্তু যার আবেদন হবে আসমানি আবেদন।

খসরু পারস্যের সুফি কবিতা আর ভারতের লোকজ সুরকে এক সুতোয় গাঁথলেন। আর উদ্ভাবন করলেন ‘গজল’, ‘কাউল’ এবং ‘কালবানা’র মতো নতুন গায়কী। খসরুর জীবনযাপন ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা। দিনে তিনি থাকতেন সুলতানের দরবারে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে, আর রাতে তিনি হয়ে যেতেন নিজামুদ্দিনের একনিষ্ঠ সেবক। তার তৈরি করা ‘ছাপ তিলক’ বা ‘আজ রং হ্যায়’ আজও প্রতিটি কাওয়ালি মাহফিলের প্রাণ। খসরু কেবল সংগীতে সুর দেননি, তিনি কাওয়ালদের একটি দল তৈরি করেছিলেন যাদের বলা হতো ‘কাওয়াল বাচ্চাস’। এই বংশপরম্পরাই আজও দিল্লি ও আজমিরের গলিগুলোতে কাওয়ালির মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে।

Nusrat Fateh Ali Khan. Image Source: Public Domain

ভারত থেকে বিশ্ব

কাওয়ালিকে যদি আমির খসরু জন্ম দিয়ে থাকেন, তবে তাকে বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছেন নুসরাত ফতেহ আলী খান। পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের এক কট্টর সংগীত পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা উস্তাদ ফতেহ আলী খানও কাওয়ালি ছিলেন, সেকারণেই বোধহয় চেয়েছিলেন ছেলে কাওয়ালি না হয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক, কারণ কাওয়ালদের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠোর ও অনিশ্চিত। কিন্তু নুসরাতের রক্তে ছিল সুর। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যখন দলের হাল ধরলেন, তখন কাওয়ালি ছিল মূলত দক্ষিণ এশিয়ার মাজারগুলোর ভেতরে সীমাবদ্ধ।

নুসরাত দিনে টানা দশ-বারো ঘণ্টা রেওয়াজ করতেন। তার কণ্ঠের ব্যাপ্তি ছিল অবিশ্বাস্য। ১৯৭০-এর দশকের শেষে যখন তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সামনে প্রথম গাইলেন, লোকে স্তম্ভিত হয়ে গেল। মানুষ ভাষা বুঝত না, কিন্তু তার গায়কীর তীব্রতা আর মরমি টানে শ্রোতারা কাঁদত, নাচত, এমনকি মূর্ছা যেত। নুসরাত কেবল প্রথাগত কাওয়ালিতে আটকে থাকেননি; তিনি কাজ করেছেন পিটার গ্যাব্রিয়েলের মতো মিউজিশিয়ানদের সাথেও। ওয়েস্টার্ন ফিউশনে কাওয়ালির তাল বসিয়েছেন।

নুসরাতের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা, কিন্তু যখন তিনি গাইতে বসতেন, তখন তার চোখ-মুখের অভিব্যক্তি আর হাতের মুদ্রায় মনে হতো তিনি যেন এই পৃথিবীর কোনো মানুষ নন। তার মাধ্যমেই কাওয়ালি প্রথমবার প্যারিস, লন্ডন আর নিউইয়র্কের কনসার্ট হলে রাজকীয় সম্মান পায়। তাই বিশ্বজুড়ে ভক্তরা তাকে চেনে শাহানশাহ -ই- কাওয়ালি বা কাওয়ালির রাজাদের রাজা নামে।

The Sabri Brothers & Ensemble. Image Source : Public Domain

কাওয়ালির ইতিহাসে ‘সবরি ব্রাদার্স’ অর্থাৎ গোলাম ফরিদ সবরি ও মকবুল আহমেদ সবরি ছিলেন এক আভিজাত্যের প্রতীক। গায়কী ছিল অত্যন্ত গম্ভীর এবং শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে ঠাসা। তাদের গলায় ‘ভর দো ঝোলি’ শুনে শ্রোতাদের মনে হতো সত্যিই তারা মহান রবের কাছে হাত পেতেছে। জীবন ছিল শৃঙ্খলায় মোড়া। করাচির সাধারণ মহল্লায় থেকেও তারা যখন মঞ্চে উঠতেন, তখন তাদের পরিহিত জমকালো আচকান আর টুপি এক রাজকীয় আবহ তৈরি করত।

অন্যদিকে, আজিজ মিঁয়া ছিলেন এক বিদ্রোহী চড়ুইপাখি প্রায়। তার কাওয়ালি ছিল বিতর্কের আর তর্কের। মনে হতো মঞ্চে বসে খোদার সাথে সরাসরি বিতর্কে আছেন, মান-অভিমানও চলত। তার হাতে থাকত তসবিহ আর মুখে থাকত খোদাপ্রেমের উন্মাদনা। জীবন ছিল যাযাবরের মতো, অস্থিরতায় ভরা। তিনি যখন ‘তেরি সুরত’ বা ‘ম্যায় শরাবি’ গাইতেন, তখন প্রথাগত ধার্মিকরা চমকে উঠতেন, কিন্তু আধ্যাত্মিক মানুষরা খুঁজে পেতেন আসল সত্য। এই ভিন্ন ভিন্ন জীবনবোধই কাওয়ালিকে এক বহুমাত্রিক শিল্পে পরিণত করেছে।

Fareed Ayaz. Image Source : Public Domain

আজকের যুগে কাওয়ালি তার ভোল বদলেছে কিন্তু তার আত্মা কি আগের মতো আছে? কোক স্টুডিও, সুফিস্কোর,রেখতা কিংবা বিভিন্ন মিউজিক প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে এখন কাওয়ালি আরও রঙিন, আরও আধুনিক। এ আর রহমানের মতো জাদুকরী সংগীত পরিচালক কাওয়ালিকে সিনেমার পর্দায় এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, আজকের দিনের শ্রোতারাও ‘কুন ফায়াকুন’ গুনগুন করে। ফরিদ আয়াজ এবং আবু মোহাম্মদের মতো শিল্পীরা এখনো আমির খসরুর সেই খাঁটি ঘরানাকে টিকিয়ে রেখেছেন। পূর্বপুরুষদের শেখানো এই সুরের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছাই কাওয়ালিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

ভবিষ্যতে কাওয়ালি হয়তো আরও বেশি টেকনোলজি বা ইলেকট্রনিক মিউজিকের সাথে মিশবে ঠিকই, কিন্তু এর মৌলিক শক্তি, সেই তালি আর খোদাপ্রেমের আর্তনাদ; ফুরাবে না কখনোই। যতক্ষণ মানুষের মনে আধ্যাত্মিক ক্ষুধা থাকবে, ততক্ষণ কাওয়ালি বেঁচে থাকবে।

উমাইর মাহারভী অঙ্গন-এর একজন স্টাফ রাইটার।

উমাইর মাহারভী থেকে আরো

থেকে আরো

যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্ব ও সেলুলয়েডের জয়যাত্রা

যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্ব ও সেলুলয়েডের জয়যাত্রা

ফিল্ম ফেস্টিভাল মানেই কেবল জমকালো লাল গালিচার অনুষ্ঠান ভাবাটা ভুল হবে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রাখে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।

.tv মানে টেলিভিশন না, টুভালু

.tv মানে টেলিভিশন না, টুভালু

কোথাও .tv দেখলে অনেকেই ধরে নেই, এটি হয়তো Television এর সংক্ষিপ্ত রূপ। কিন্তু এর সাথে টেলিভিশনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

‘ভালনারেবিলিটি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ - আল পাচিনো

‘ভালনারেবিলিটি’ খুব গুরুত্বপূর্ণ – আল পাচিনো

‘দ্য গডফাদার’-এর মাইকেল করলিয়নি থেকে ‘স্কারফেস’-এর টনি মন্টানা, প্রতিটি চরিত্রে আল পাচিনো নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন এক অদ্ভুত তীব্রতায়।

Scroll to Top