ফিচার ছবি : ছবিতে প্রখ্যাত সিরীয় কবি নিজার কাব্বানি ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, ইরাকি শিক্ষাবিদ বালজিস আল-রাবি।
নিজার কাব্বানি (১৯২৩–১৯৯৮) ছিলেন সমসাময়িক আরব বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী কবি। প্রেম, নারী অধিকার ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। ১৯৬৯ সালে ইরাকে আল-রাবি‘র সাথে প্রথম দেখা হয় কাব্বানির এবং সেই বছরই তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮১ সালে বৈরুতে ইরাকি দূতাবাসে কর্মরত থাকাকালীন এক ভয়াবহ বোমা হামলায় বালজিস আল-রাবি প্রাণ হারান।
পড়ুন, তানভিরুল হক রাহাত-এর অনুবাদে নিজার কাব্বানির কবিতা ‘তুমি ছাড়া’।
তুমি ছাড়া
নিজার কাব্বানি
১
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো পাক্কা খেলাড়ু নাই
অথচ,আমার বোকামি সয়েছ একটা দশক ধরে
আমার মাতলামি তুমি ছাড়া কেউ নেয় নাই
আমার নখগুলা কেটে দাও তুমি
লেখার খাতাগুলা গুছায়া রাখো
তুমিই নিয়ে গেছিলে আমাকে শিশুদের দিকে।
২
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোন নারী দেয় নাই তুলনা
চিন্তা ফিকির,
বুঝদারি আর উন্মাদনা,
দ্রুত জড়ায়ে পড়া আর
সহজে ঝুকে পড়াকে আমার
তৈলচিত্রের সাথে
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি —
তুমি ছাড়া কোনো নারী অর্ধেক নজরও কাড়তে পারে নাই আমার
তুমিই আমাকে কলোনি বানিয়েছ
এবং এতো আজাদী তুমি ছাড়া দেয় নাই কোনো নারী
৩
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই
আমার সাথে যার আচরণ
যেন চব্বিশ মাসের শিশু কোনো আমি
তুমি ছাড়া কেউ পেশ করে নাই চড়ুইপাখির দুধ
তুমি ছাড়া দেয় নাই কেউ
এত এত ফুল আর সমূহ খেলনা
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কেউ নাই দরিয়ার মতো উদার
আর কবিতার মতো স্বচ্ছ
এতো আদর কে দিছে তুমি ছাড়া!
তুমি যেমন বরবাদ করলে কেউ করে নাই
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
শৈশব আমার লম্বা করলে
পঞ্চাশ বছর টেনে
তুমি ছাড়া কেউ করে নাই
৪
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া
সে-ই নারীকূল বলবে এমন
সাধ্য নাই কোনো নারীর
কেন্দ্রীভূত এই দুনিয়া তোমারই নাভির ভিতর
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
ছুটে তোমার হাটা ধরেই গাছগুলা সব পেছন পেছন
বরফি শরীর থেকেই তোমার পায়রা করে পান
যার উষ্ণ বগল তলের ঘাষ ভোজন করে ভেড়ার দল
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি— তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই
যে দুই কালিমায় বয়ান করে নারীজাতির ইতিবৃত্ত
সাক্ষ্য দিচ্ছি আরো—
তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই জাগাতে পারে পৌরুষ আমার
৫
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই
যামানা থেমে যায় যার ডান স্তনে
বাম স্তনের ঢালু থেকে যার বিপ্লব উঠে মাথাচাড়া দিয়ে
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
দুনিয়ার নিয়ম ভাঙার তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই
তুমিই পারো পালটে দিতে হালাল-হারামের নকশাটার
৬
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
কোনো নারীর প্রেম আমাকে নাড়াতে পারে নাই
তুমি আদর দিলে দুনিয়া কাপতে থাকে
আমাকে পুড়াও, আমাকে ডুবাও,
আগুনে জ্বালাও, প্রশমিত করো আবার
চাদের মতো আমাকে দুই ভাগ করো,
টুকরা টুকরা করে ফেলো
তুমিই কেবল এমন লম্বা দখলদারি নিয়ে ঢুকে পড়লে মনের ভিতর
এমন তৃপ্তির জবরদস্তি নিয়ে
বপন করলে আমাকে তুমি
দামেস্কিয় গোলাপ যেন
যেন পুদিনা আর কমলা আমি
হে আমার নারী—
আমার সুয়ালগুলা চুলের নিচে ফেলে রাখে তার
একটা জবাব দিলো না সে
হে নারী! যে পুরাটাই বুলি
মনে মনে যাবে ছোয়া
যায় না তবে মুখে বলা
৭
হে গভীর দুই চোখ!
হে প্রজ্বলিত দুই হাত!
হে আলো করে আসা হাজেরী!
হে রুপার মতো সাদা!
হে কাচের মত স্নিগ্ধ!
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
সমস্ত যামানা তোমারই কোমর আকড়ে ধরে
তোমারই চারপাশে হাজার নক্ষত্র জেগে থাকে
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
ইয়া হাবিবী! ইয়া হাবিবী!
তুমি ছাড়া নাই কোনো নারী
যার কোলে বেড়ে উঠে আদমের পয়লা শিশু
শেষ শিশুটাও তার বুকে
৮
হে কোমল নির্মল!
পবিত্র কুমারি!
হুসনেজামাল চিত্তগ্রাহী!
বাবুটা আমার !
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী আহলে কাহাফের হুকুম থেকে আজাদ না
তুমিই ভেঙেছ মূর্তি তাদের
কাটিয়ে তুললে খেয়ালিপনা
কাহাফবাসীর সালতানাত তোমার হাতেই টুকরা টুকরা
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী কবিলার খঞ্জরগুলা নেয় নাই কবুল করে বুকের উপর
আর তুমি ছাড়া আমার পিরিত নেয় নাই তুলে কোনো নারী একাগ্রতা নিয়ে
৯
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী আসে নাই এমন নিখুত
যেভাবে ইনতেজারে ছিলাম আমি।
আমার কামনা আর স্বপ্নেরও দীর্ঘ কেবল তোমারই চুল
তোমার স্তনের আকার পেয়ে গেছি
আমার নকশারই মোতাবেক
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আরো—
যদি করি ধূমপান
তুমি ছাড়া নাই কোনো নারী আমার ধোয়ার কুণ্ডলির ভিতর
তুমিই বের হয়ে আসো ধোয়ার মেঘ থেকে
যখন আমি ফিকির করি, শাদা কবুতর হয়ে উড়তে থাকো আমার চিন্তার ভিতর
হে নারী— যাকে লিখলাম আমার সমস্ত লেখার ভিতর!
আমার সমগ্র কবিতার পরও আছো তুমি
যত কবিতা করলাম তার চে আরো বেশি হয়ে সুন্দর তুমি
১০
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
সভ্যতার শেষ প্রেম তুমিই দিয়েছ আমাকে
তুমিই এনেছ তুলে তৃতীয় বিশ্বের ধূলাবালি থেকে আমাকে
আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই
যে আমার দুর্বোধ্য প্যাচ খুলে
তুমিই সাজিয়ে তুললে অঙ্গ আমার
তুমিই বাজালে গিটারের মতো আমাকে
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—
তুমি ছাড়া কোনো নারী নাই
তুমিই একমাত্র নারী