আর্ট-কালচার একটা জাতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আর এই আর্ট-কালচারের বড় একটা ইউনিভার্স হলো সিনেমা জগত। সিনেমা বা চলচ্চিত্র আমাদের জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে রয়েছে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরে বিনোদন দুনিয়ার খবরাখবর নেয়া একজন সিনেমাপ্রেমী দৈনন্দিন কাজ। তবে সচরাচর ভালো সিনেমা খুঁজে পাওয়া মুশকিলই বটে। তাই একজন সিনেমাপ্রেমীর জন্য ভরসা থাকে ফিল্ম ফেস্টিভাল। সোজা বাংলায় চলচ্চিত্রের মেলা। কিন্তু বাংলাদেশে ফিল্ম ফেস্টিভাল নাই বললেই চলে। যাও আছে; ভালো মানের ফিল্ম প্রডিউস না হওয়ায়, বিদেশি সিনেমার জোড়ে নামে মাত্র চলছে। দেশের ফিল্ম ফেস্টিভালের গুরুত্ব এমন যে কখন আসে আর কখন যায় শোনাই না। কিন্তু, বহির্বিশ্বে ফিল্ম ফেস্টিভালগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। ফিল্ম ফেস্টিভাল বা চলচ্চিত্র উৎসব মানেই কেবল জমকালো লাল গালিচার অনুষ্ঠান ভাবাটা ভুল হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রাখে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, যেখানে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক সত্তা; বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে সৃজনশীলতার উপর ভর করে চলে। এই ফেস্টিভালগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণের শ্রেষ্ঠত্বকে উদযাপন করে এমন কিছু বাছাইকৃত কাজের মাধ্যমে, যা মূলত মাঠপর্যায়ের নতুন প্রতিভাদের তুলে ধরে। অবস্য এখন এর প্রতি মানুষের ভরসা হ্রাস পাচ্ছে। তবে তারপরও বছরে একবার সব শিল্পীদের একসাথে দেখতে মুখিয়ে থাকে দর্শক।
অন্যদিকে নির্মাতাদের জন্য ফিল্ম ফেস্টিভাল হলো প্রেস্টিজের ব্যাপার। এধরণের উৎসবগুলো উদীয়মান প্রতিভাদের পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করে আর এমন সব নির্মাতাদের দর্শকদের সাথে পরিচিত করে দেয়, যারা অন্যথায় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যেতেন। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত পরিচালক প্রথম এই উৎসবগুলোর মাধ্যমেই নজরে আসেন। যেমন ধরেন, কোয়েন্টিন টারান্টিনো সানড্যান্স উৎসবে তাঁর “রিজারভয়ার ডগস” (Reservoir Dogs) প্রদর্শন করেছিলেন, আর পেদ্রো আলমোদোভার কানে তুলে ধরেছিলেন “অল অ্যাবাউট মাই মাদার” (All About My Mother)। ক্রিস্টোফার নোলানও তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘Following’ (১৯৯৮) নিয়ে সান ফ্রান্সিসকো এবং রটারড্যামের মতো ফেস্টিভ্যালগুলোতে অংশ নেন। তবে তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘Memento‘ ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হওয়ার পর তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক সত্যজিৎ রায়ও তার প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ কে ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত করেই ‘Best Human Document’ পুরস্কার জিতে বিশ্ব জয় করেছিলেন।
এই ধরণের আয়োজনগুলো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রযোজক, বিনিয়োগকারী এবং প্রতিষ্ঠিত পরিচালকদের সাথে যোগাযোগ তৈরির সুযোগ দেয়।
ভেনিস : চলচ্চিত্র উৎসব
চলচ্চিত্র উৎসবের এই রীত প্রথমে একেঁছিল ইতালির ভাসমান শহর ভেনিস। নয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব চলচ্চিত্র সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। ১৯৩২ সালের ৬ আগস্ট, গ্রীষ্মের মনোরম লিডো দ্বীপে এই মহতী চলচ্চিত্রের আসরটি শুরু হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র উৎসবের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
হোটেল এক্সেলসিয়রের ছাদে রুবেন মামুলিয়ান পরিচালিত “ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড” (Dr. Jekyll and Mr. Hyde) প্রদর্শনের মাধ্যমে এই উৎসবের পর্দা ওঠে। কাউন্ট জিউসেপ ভলপি দি মিসুরাতা, আন্তোনিও মারাইনি এবং লুসিয়ানো দে ফিও-এর হাত ধরে প্রথম আসরে নয়টি দেশের চলচ্চিত্র স্থান পায়। উৎসবের মূল নাম “এসপোসিজিওনে ইন্টারনাজিওনালে ডি’আর্তে সিনেমাটোগ্রাফিকা” (Esposizione Internazionale d’Arte Cinematografica) ১৯৩৪ সালে পরিবর্তিত হয়ে “মোস্ট্রা” (Mostra) রাখা হয়। শুরুতে এটি ভেনিস বিয়েনালের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রের শিল্পকে উদযাপনের একটি অ-প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন ছিল।
রেনে ক্লেয়ার, আর্নস্ট লুবিচ, ফ্রাঙ্ক ক্যাপ্রা এবং হাওয়ার্ড হকস-এর মতো বরেণ্য পরিচালকদের কাজ সেই বছর প্রদর্শিত হয়েছিল। তখন উৎসবে কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার ছিল না; বরং দর্শকরাই তাদের প্রিয় চলচ্চিত্রের জন্য ভোট দিতেন। “আ নু লা লিবের্তে” (À Nous la Liberté) পায় ‘সবচেয়ে হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র’ (Funniest Film), “দ্য সিন অফ ম্যাডেলন ক্লডেট” (The Sin of Madelon Claudet) পায় ‘সবচেয়ে মরমী চলচ্চিত্র’ (Most Moving Film), এবং “ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড” অর্জন করে ‘সবচেয়ে মৌলিক চলচ্চিত্র’ (Most Original Film) এর খেতাব।
উৎসবটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৪ সালের মধ্যে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা নয় থেকে বেড়ে ১৭-তে দাঁড়ায়। আয়োজকরা এটিকে একটি বার্ষিক ইভেন্টে পরিণত করেন এবং প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কারের প্রবর্তন করেন।
উৎসবের শুরুর দিনগুলোতে কিন্তু একটি অন্ধকার দিকও ছিল। বিয়েনালের প্রেসিডেন্ট ভলপি বেনিতো, মুসোলিনির অধীনে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি এই উৎসবকে ফ্যাসিবাদের একটি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাচ্ছিলেন।
১৯৩৪ সালে উৎসবটি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক পুরস্কার প্রবর্তন করে। “মুসোলিনি কাপ” (Mussolini Cup) সেরা ইতালীয় চলচ্চিত্র এবং সেরা বিদেশি চলচ্চিত্রকে প্রদান করা হতো। চলচ্চিত্র গবেষক মারলা স্টোন উল্লেখ করেছেন যে,
“হলিউড এবং আন্তর্জাতিক দর্শকদের অংশগ্রহণে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনটি তৎকালীন সরকারকে গ্ল্যামার, আধুনিকতা এবং শৈলীর একটি বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল।”
ধীরে ধীরে রাজনীতি উৎসবটিকে গ্রাস করে ফেলে। ১৯৩৮ সাল নাগাদ ফ্যাসিবাদের নিয়ন্ত্রণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন লেনি রিফেনস্টাল-এর “অলিম্পিয়া” (Olympia),যা ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক নিয়ে নির্মিত;বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে মুসোলিনি কাপ জিতে নেয়। এর প্রতিবাদে ব্রিটিশ, ফরাসি এবং মার্কিন জুরি সদস্যরা পদত্যাগ করেন। ১৯৩৮ সাল থেকে নাৎসি জার্মান প্রযোজনার চলচ্চিত্রগুলোই পুরস্কারের ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।
১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এই উৎসবটি “জার্মান-ইতালীয় চলচ্চিত্র উৎসব” (German-Italian Film Festival) হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন শুধু জার্মানি, ইতালি এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতো। তাই এই বছরগুলোকে উৎসবের অফিসিয়াল বা দাপ্তরিক ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে, ১৯৪৬ সালে উৎসবটি পুনরায় শুরু হয়। যা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। যুদ্ধের বছরগুলোর গ্লানি মুছে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং শৈল্পিক সততা ফিরিয়ে আনতে সবাই কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। শীর্ষ পুরস্কার হিসেবে মুসোলিনি কাপ বাদ দিয়ে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় “গোল্ডেন লায়ন” বা স্বর্ণ সিংহ (Leone d’Oro)।
যুদ্ধ-পরবর্তী সংস্করণগুলো ফ্যাসিবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। উৎসবটি শৈল্পিক স্বাধীনতার প্রতি তার অটল নিষ্ঠা পুনরায় ফুটিয়ে তোলে। ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে ভেনিস পরীক্ষামূলক (Experimental) চলচ্চিত্রের একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা এখানে তাদের অনন্য স্টোরি বলার প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পান।
বর্তমান ডিজিটাল যুগেও ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে “ওরিজোন্তি” (Orizzonti)-র মতো নতুন প্রতিযোগিতামূলক বিভাগ চালু হয়, যা মূলত উদ্ভাবনী চলচ্চিত্র এবং নতুন পরিচালকদের প্রতিভাকে প্রাধান্য দেয়। ২০১৭ সালে ভেনিস প্রথম বড় কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির (VR) জন্য নিজস্ব প্রতিযোগিতা চালু করে ইতিহাস গড়ে। ২০২২ সালে “ভেনিস ভার্চুয়াল রিয়েলিটি” নাম বদলে “ভেনিস ইমারসিভ” (Venice Immersive) রাখা হয়, যা বর্তমানে এই নতুন মাধ্যমে বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
“ভেনিস ক্লাসিকস” (Venice Classics) প্রোগ্রামের মাধ্যমে উৎসবটি চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে সম্মান জানায়। এই প্রোগ্রামে বিয়েনালের আর্কাইভে পাওয়া পুরোনো ছবির পুনরুদ্ধারকৃত সংস্করণ এবং দুর্লভ কপিগুলো প্রদর্শন করে। ২০১২ সালে শুরু হওয়া “বিয়েনাল কলেজ-সিনেমা” প্রোগ্রামটি বিশ্বজুড়ে তরুণ নির্মাতাদের স্বল্প বাজেটের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা করে।
ভেনিস এখন অস্কার প্রত্যাশীদের জন্য একটি লঞ্চপ্যাড বা সূতিকাগারে পরিণত হয়েছে। এখানে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হওয়া অনেক চলচ্চিত্রই পরবর্তীতে সমালোচকদের প্রশংসা এবং বড় বড় পুরস্কার জয় করে।
কান : চলচ্চিত্র উৎসব
বর্তমানে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মিলনমেলা হিসেবে স্বীকৃত কান চলচ্চিত্র উৎসব। চলচ্চিত্রের এই উদযাপনটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে অটল সংকল্পের এক প্রতীক।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের ধারণাটি প্রাণ পায় ১৯৩৯ সালের মে মাসে। সরাসরি ফ্যাসিবাদী প্রভাবাধীন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল কান। ফরাসি সাংস্কৃতিক কূটনীতিক ফিলিপ এরলাঙ্গার এবং ফ্রান্সের শিক্ষা ও ললিতকলা মন্ত্রী জঁ জে একটি স্বতন্ত্র ইভেন্ট তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন, চলচ্চিত্রকে কেবল তার শৈল্পিক গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত।
কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি সব বদলে দিল। ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯; যেদিন উৎসবটি শুরু হওয়ার কথা ছিল; জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে উৎসবটি মাত্র একটি চলচ্চিত্র, উইলিয়াম ডিটারলের “দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম” (The Hunchback of Notre Dame) প্রদর্শনের পর বন্ধ হয়ে যায়।
যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে বিশ্ব যখন আবার গড়ে উঠছে, কান তার প্রথম প্রকৃত উৎসব আয়োজন করে। ১৯৪৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মিউনিসিপাল ক্যাসিনোতে ২১টি দেশ তাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। মার্কিন গায়িকা গ্রেস মুর এই আবেগপ্রবণ জনতার সামনে “মার্সেইয়েজ” (ফরাসি জাতীয় সংগীত) গেয়ে শোনান। বছরের পর বছর, অন্ধকারের পর এই সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণকে সবাই মিলে উদযাপন করেন। সেই প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই রবার্তো রোসেলিনির “রোম, ওপেন সিটি” (Rome, Open City) ইতালীয় নিও-রিয়ালিজম বা নব্য-বাস্তববাদের সূচনা করে এবং জঁ কক্টো-র “বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট” প্রদর্শিত হয়।
শৈল্পিক দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কানের ডিএনএ-তে মিশে আছে। উৎসবের নিয়মে এমন চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল যা “যেকোনো রাষ্ট্রের জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে”। শৈল্পিক স্বাধীনতার প্রতি এই প্রতিশ্রুতি দশকের পর দশক ধরে কানের পরিচয় গড়ে দিয়েছে।
এই ঐতিহ্য আজও জীবন্ত। ২০২৫ সালে ইরানি পরিচালক জাফর পানাহির ‘পাম দ’অর’ (Palme d’Or) জয় এই সত্যকে পুনরায় প্রমাণ করে। কানে তাঁর উপস্থিতি এক বিস্ময়কর পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয় সেই নির্মাতার জন্য, যিনি মাত্র কয়েক বছর আগে ইরানের কুখ্যাত কারাগারে বন্দি ছিলেন।
২০২৫ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রবার্ট ডি নিরো জোরালো কণ্ঠে বলেছিলেন, “শিল্প হলো বিশ্বের স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিস্টদের জন্য একটি হুমকি।” সে বছর কান তার উদ্বোধনী দিনটি ইউক্রেনের জন্য উৎসর্গ করে এবং চলমান সংঘাত নিয়ে তিনটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করে।
১৯৫৫ সালে ‘গ্র্যান্ড প্রি’ (Grand Prix) পুরস্কার ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘পাম দ’অর’ (Palme d’Or) প্রবর্তিত হয়। এই সম্মানজনক পুরস্কার অনেক মাস্টারপিস বা কালজয়ী চলচ্চিত্রকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর করে দিয়েছে। মার্টিন স্কোরসেসির “ট্যাক্সি ড্রাইভার” (Taxi Driver, ১৯৭৬), ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা-র “অ্যাপোক্যালিপস নাউ” (Apocalypse Now, ১৯৭৯) এবং কোয়েন্টিন টারান্টিনোর “পাল্প ফিকশন” (Pulp Fiction, ১৯৯৪) সবই এই পুরস্কারটি অর্জন করেছে।
কান উৎসব তার প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্দেশ্যের প্রতি সবসময়ই অনুগত। চলচ্চিত্রের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং এর মান বাড়ানো, যার লক্ষ্য হলো চলচ্চিত্রের উন্নয়নে অবদান রাখা, বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র শিল্পকে চাঙ্গা করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিনেমাকে উদযাপন করা। কান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে লুকানো রত্নগুলোর পাশাপাশি মূলধারার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে।
সেটা দেখা যায় ২০২৪ সালে শন বেকারের “আনোরা” (Anora) পাম দ’অর এর জয় দিয়ে। সিনেমাটি ২০২৫ সালের পুরস্কারের মৌসুমে আধিপত্য বিস্তার করে অস্কারে সেরা ছবি এবং সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতে নেয়।
টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল
আজকের দিনে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী উৎসব হলে ‘টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (TIFF)‘। শুরুটা ছিল বেশ সাধারণ এবং কিছুটা চ্যালেঞ্জিং।
১৯৭৬ সালে বিল মার্শাল, হেনক ভ্যান ডার কোল্ক এবং ডাস্টি কোল মিলে এই উৎসবটি শুরু করেন। তখন এর নাম ছিল “Festival of Festivals”। নামটি এমন দেওয়ার কারণ ছিল; তৎকালীন সময়ের অন্যান্য নামী উৎসবগুলোর (যেমন কান বা বার্লিন) সেরা সিনেমাগুলো এক ছাদের নিচে এনে টরন্টোর দর্শকদের দেখানো। ইন্টারেস্টিং তাই না
প্রথম বছর উৎসবটিতে ৩০টি দেশের ১২৭টি সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় হলিউড স্টুডিওগুলো এই উৎসবকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তারা মনে করেছিল, কানাডার দর্শকরা হয়তো বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই ধারাটি গ্রহণ করবে না। কিন্তু উদ্বোধনী বছরেই প্রায় ৩৫,০০০ দর্শক সমাগম ঘটে, যা আয়োজকদের অবাক করে দিয়েছিল।
শুরুর প্রায় ১৮ বছর পর, ১৯৯৪ সালে উৎসবটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Toronto International Film Festival (TIFF)। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এটি বিশ্বের অন্যতম “এ-লিস্ট” (A-list) ফেস্টিভ্যাল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
TIFF-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর “People’s Choice Award”। অন্যান্য উৎসবে যেখানে বিচারকমন্ডলী সেরা ছবি বাছাই করেন, টরন্টোতে সাধারণ দর্শকরা ভোট দিয়ে সেরা ছবি নির্বাচন করেন।
১৯৮১ সালে ‘Chariots of Fire’ এখানে প্রদর্শিত হওয়ার পর অস্কার জেতে। পরবর্তীতে American Beauty, Slumdog Millionaire, The King’s Speech, এবং Parasite-এর মতো সিনেমাগুলো এখান থেকেই অস্কারের দৌড়ে এগিয়ে যায়।
আজ TIFF কেবল একটি উৎসব নয়, এটি একটি বিশাল চলচ্চিত্র বাজার। বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৩-৪ লাখ দর্শক এবং হাজার হাজার চলচ্চিত্র কর্মী এখানে অংশ নেন। ২০১০ সালে টরন্টোতে তাদের নিজস্ব সদর দপ্তর ‘TIFF Bell Lightbox’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সারা বছর চলচ্চিত্রের প্রচার ও প্রসারে কাজ করে।
বিশ্ববিখ্যাত অনেক নির্মাতারাই এখান থেকেই তাদের ক্যারিয়ারের দৌঁড় দেন। পল থমাস অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৯৯৭ সালের টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। সেখানে তার পরিচালিত ‘Boogie Nights’ সিনেমার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। এই ছবিটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি তাকে হলিউডের একজন প্রতিভাবান নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ড্যানি বয়েল যদিও আগেই কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তার ‘Slumdog Millionaire’ (২০০৮) সিনেমাটি টরন্টোতে প্রদর্শিত হওয়ার পর যে বিশাল সাড়া পায়, তা ছিল অভাবনীয়। এই উৎসবে সিনেমাটি ‘পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’ জেতে এবং পরবর্তীতে অস্কারে ৮টি পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়ে। এর মাধ্যমেই তিনি বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
এমন আরো কিছু নির্মাতাদের মধ্যে রয়েছেন কানাডিয়ান পরিচালক সারা পলি। আছে ব্যারি জেনকিন্স। এমনকি ভারতীয় পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজের শেক্সপিয়ার ট্রিলজির প্রথম সিনেমা ‘Maqbool’ (২০০৩) এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছিল এই টরন্টো উৎসবেই।
সানড্যান্স : চলচ্চিত্র উৎসব
এখন আসা যাক চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বাজার আমেরিকায়। আমেরিকার প্রধান চলচ্চিত্র উৎসবটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ইউটা অঙ্গরাজ্যের পাহাড়ি শহর পার্ক সিটিতে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে। নাম, সানড্যান্স। ইউরোপীয় উৎসবগুলোর মতো না হলেও, এটি কালক্রমে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন চলচ্চিত্রের বিকাশে এক অপরিহার্য প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
৪৫ বছর আগে ‘ইউটা/ইউএস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’ শুরু হয়েছিল মূলত ইউটাতে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আকৃষ্ট করার একটি সহজ লক্ষ্য নিয়ে। এটি এমন সব মার্কিন চলচ্চিত্র প্রদর্শন করত যা হলিউড সাধারণত উপেক্ষা করত। ১৯৮৫ সালে একটি বড় পরিবর্তন আসে যখন অভিনেতা রবার্ট রেফোর্ডের ‘সানড্যান্স ইনস্টিটিউট’ এটির সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। উৎসবটি তখন মুক্তচিন্তার গল্প ও তথ্যচিত্রের ১০ দিনের এক উৎসবে রূপ নেয়। ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’।
সানড্যান্স অসংখ্য আর্টিস্টের ক্যারিয়ার এবং চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৮৯ সালে স্টিভেন সোডারবার্গের “সেক্স, লাইজ, অ্যান্ড ভিডিওটেপ” (sex, lies, and videotape) দর্শক পুরস্কার জিতে নেয় এবং স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণকে মূলধারার পাদপ্রদীপে নিয়ে আসে। এই উৎসবটি কোয়েন্টিন টারান্টিনোর “রিজারভয়ার ডগস”, কেভিন স্মিথের “ক্লার্কস” (Clerks) এবং ড্যামিয়েন চ্যাজেলের “হুইপল্যাশ” (Whiplash)-এর মতো যুগান্তকারী চলচ্চিত্রগুলোকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে, যা পরবর্তীতে ব্যাপক সমাদৃত হয়।
সানড্যান্স এখন কেবল আমেরিকার ইউটাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সানড্যান্স লন্ডন এবং সানড্যান্স হংকং-এর মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনের মাধ্যমে এর ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে। উৎসবটি সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং গল্প বলার নতুন নতুন ফরম্যাটকে গ্রহণ করছে। ২০১৮ সালে যুক্ত হওয়া ‘ইন্ডি এপিসোডিক’ (Indie Episodic) বিভাগটি এই উদ্ভাবনী মানসিকতারই প্রমাণ।
তিবিলিসি : চলচ্চিত্র উৎসব
২০০০ সালে “সাচুকারি” (Sachukari) শিল্প উৎসবের অংশ হিসেবে ‘তিবিলিসি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ শুরু হয়েছিল। এই উৎসব জর্জিয়ার দর্শকদের জন্য উচ্চমানের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নিয়ে আসে এবং বিশ্বব্যাপী জর্জিয়ান চলচ্চিত্রকে প্রমোট করে। প্রতি বছর এর গুরুত্ব বাড়ছে এবং অনেক নামী নির্মাতা এতে অংশ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন।
গোল্ডেন অ্যাপ্রিকট : চলচ্চিত্র উৎসব
তিনজন একনিষ্ঠ চলচ্চিত্রপ্রেমী; হারুতুন খাচাতরিয়ান, মিকায়েল স্টাম্বলটজিয়ান এবং সুজানা হারুতুনিয়ান; ২০০৪ সালে ‘গোল্ডেন অ্যাপ্রিকট ইয়েরেভান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ চালু করেন। উৎসবটি Crossroads of Cultures and Civilizations থিম নিয়ে উদযাপিত হয়। আর্মেনিয়ার জাতীয় ফল এপ্রিকট থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য, তথ্যচিত্র এবং আর্মেনীয় প্যানোরামা বিভাগে গোল্ডেন এবং সিলভার অ্যাপ্রিকট পুরস্কার প্রদান করা হয়। এছাড়া আজীবন সম্মাননা হিসেবে দেওয়া হয় মর্যাদাপূর্ণ ‘প্যারাডজানভস থ্যালার অ্যাওয়ার্ড’।
গোল্ডেন অ্যাপ্রিকটের অতিথি তালিকায় রয়েছেন অ্যাটম ইগোয়ান, আলেকজান্ডার পেইন, কেভিন স্পেসি এবং তারসেম সিং-এর মতো ব্যক্তিরা। ২০২৫ সালে উৎসবটির ২২তম আসর শুরু হয় ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহির “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” (It Was Just an Accident) প্রদর্শনের মাধ্যমে।
চলচ্চিত্র উৎসবগুলোই চলচ্চিত্র সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। যা শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক বিবৃতি হিসেবে, তা আজ বিশ্বজুড়ে শৈল্পিক অভিব্যক্তির রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আয়োজনগুলো নির্মাতাদের বাণিজ্যিক চাপ ছাড়াই তাদের কাজ প্রদর্শনের একটি প্ল্যাটফর্ম দেয়। মূলধারার সিনেমা শাসন করা আজকের অনেক নামী পরিচালকই প্রথম এই উৎসবগুলোতে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
এই উৎসবগুলোই নির্ধারণ করে আমরা কী দেখব। এগুলো বিকল্প পরিবেশনা মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং কোন চলচ্চিত্রটি দর্শকদের কাছে পৌঁছাবে তাও অনেকটা ঠিক করে। দর্শকদের এমন সব দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে যা মূলধারার চলচ্চিত্রে খুব কমই দেখা যায়।